ফেসবুক: উগ্রবাদী মত প্রচারের তালিকায় বাংলাদেশের এক ব্যক্তি ও চার সংগঠন

কামরান রেজা চৌধুরী
2021.10.14
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ফেসবুক: উগ্রবাদী মত প্রচারের তালিকায় বাংলাদেশের এক ব্যক্তি ও চার সংগঠন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এর দুই সদস্য বগুড়ায় আত্মসমর্পণ করে জঙ্গিবাদ ত্যাগ করার ঘোষণা দেবার পর তাঁদের গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে র‍্যাব। ৫ অক্টোবর ২০১৬।
[এএফপি]

ফেসবুক ব্যবহার করে উগ্র ও জঙ্গিবাদী মতবাদ প্রচারের সাথে যুক্ত বিশ্বের চার হাজার বিপজ্জনক সংগঠন ও ব্যক্তির যে তালিকা ফাঁস হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ ভিত্তিক কমপক্ষে পাঁচটি জঙ্গি সংগঠন ও এক ব্যক্তির নাম রয়েছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ এসব সংগঠন ও ব্যক্তিকে গোপনে চিহ্নিত করেছে। তবে তালিকাটি ফাঁস করেছে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান দি ইন্টারসেপ্ট।

ফেসবুকের বিপজ্জনক সংগঠন ও ব্যক্তির গোপন তালিকা ফাঁস হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বুধবার বেনারের কাছে স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির “কাউন্টারটেররিজম অ্যান্ড ডেঞ্জারাস অর্গানাইজেশন্স” এর নীতি সম্পর্কিত বিষয়ক পরিচালক ব্রায়ান ফিশম্যান।

ফাঁস হওয়া তালিকায় থাকা বাংলাদেশি সংগঠন ও এক ব্যক্তি হলো: আল মুরসালাত মিডিয়া, ইসলামিক স্টেট বাংলাদেশ, হরকাতুল জিহাদ-ই-ইসলামী বাংলাদেশ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) এবং জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।

এই সংগঠনগুলোর মধ্যে চারটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও আল মুরসালাত মিডিয়া এখনও নিষিদ্ধ নয়। সংগঠনটি খুব একটা পরিচিতও নয় বাংলাদেশে। 

তবে ইসলামিক স্টেটস বাংলাদেশ নামে বাংলাদেশে কোনো সংগঠন নেই বলে দাবি করে আসছে সরকার। সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গি সংগঠনগুলো ইসলামিক স্টেটের নাম ব্যবহার করে নিজেদের নাম ছড়াতে চায়।

ফেসবুকের ওই তালিকায় থাকা একমাত্র বাংলাদেশি ব্যক্তির নাম তারিকুল ইসলাম। তিনি জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে ওই তালিকায়।

ফেসবুক পরিচালক ব্রায়ান ফিশম্যান বেনারকে বলেন, “আমাদের নিয়ম অনুযায়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রচারণা গ্রুপ অথবা অপরাধীচক্র আমাদের মাধ্যমটি ব্যবহার করতে পারে না। সেই অনুযায়ী এসব গ্রুপের প্রশংসা, সমর্থন অথবা প্রতিনিধিত্ব করে এমন কোনো পোস্ট আমাদের নজরে আসার সাথে সাথে আমরা সেগুলো সরিয়ে ফেলি।”

ব্রায়ান বলেন, “এই নিয়ম বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আমাদের প্রতিষ্ঠানে ৩৫০ জন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যাঁরা এই সংগঠনগুলোকে এই মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলতে এবং সম্ভাব্য হুমকিগুলোকে চিহ্নিত করতে কাজ করেন।”

তিনি বলেন, “এই নীতির আলোকে আমরা ইতোমধ্যে ২৫০টি শ্বেতাঙ্গ উগ্র জাতীয়তাবাদী গ্রুপসহ কয়েক হাজার গ্রুপকে এই প্লাটফরমে নিষিদ্ধ করেছি। নতুন নতুন গ্রুপের আবির্ভাবের কথা মাথায় রেখে আমরা এই তালিকা হালনাগাদ করে থাকি।”

ফাঁস হওয়া ফেসবুকের ওই গোপন তালিকা আমলে নিয়ে কাজ করা হবে বলে জানানো হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে। 

ফেসবুকের তালিকা ‘যথেষ্ট নয়’

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম “জঙ্গি সংগঠনগুলোর কাজ করার অন্যতম মাধ্যম,” উল্লেখ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বেনারকে বলেন, “তারা সব সময়ই অনলাইনে সক্রিয়।”

“করোনা মহামারিতে মানুষ যখন অনলাইনে বেশি সময় কাটাচ্ছে, তখন তারা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা বাড়িয়েছে,” বলেন তিনি।

তাঁর মতে, বাংলাদেশ ভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন ও ব্যক্তিকে বিপজ্জনক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ফেসবুক যে ব্যবস্থা নিয়েছে সেটি “একটি ভালো খবর” হলেও তা “যথেষ্ট নয়।” কারণ ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদীরা যে মাত্রয় সক্রিয় “সেটি বিবেচনায় নিলে এই ব্যবস্থা নিতান্তই কম।”

ফেসবুকের এই ব্যবস্থার ফলে জঙ্গিদের নিয়োগ ও উগ্রবাদী মতবাদ প্রচার কমার সম্ভাবনা খুবই কম জানিয়ে তিনি বলেন, “জঙ্গি সংগঠনগুলোতে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে পারদর্শী ও বিশেষজ্ঞ রয়েছে। এই জঙ্গি সংগঠনগুলো বিভিন্ন নামে-বেনামে এবং ভুয়া নামে আরও হিসাব খুলবে।”

তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাইবার ইউনিটের উচিত হবে, এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃপক্ষের সাথে একসাথে কাজ করে জঙ্গি ও উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর অনলাইনে অপকর্ম চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া।”

“তবে দুঃখের বিষয় হলো, জঙ্গিবাদ ছড়ানো সংগঠনগুলোকে চিহ্নিত করে তাদেরকে নিষিদ্ধ করতে ফেসবুককে অনুরোধ করা হলেও তারা সরকারের কোনো অনুরোধ আমলে নেয় না,” যোগ করেন মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার।

তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহার মতে, ফেসবুকের এই তালিকা থেকে “একটি অজানা বিষয় উন্মোচিত হয়েছে। সেটি হলো, আমরা সবাই জেএমবি, হুজি-বি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম জানি। কিন্তু আমরা আল মুরসালাত মিডিয়া এবং তারিকুল ইসলামের নাম জানি না।”

“এর অর্থ হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে যেগুলোকে আমরা চিনি না,” বলেন জোহা।

অনলাইনে সন্দেহভাজন জঙ্গিবাদী আদর্শ প্রচারের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে “কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যদের তৎপরতা বৃদ্ধি প্রয়োজন,” জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিয়েছি— এই কথা বলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।”

তালিকা পর্যবেক্ষণ করবে পুলিশ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ফারুক হোসেন বেনারকে বলেন, “ফেসবুক যে সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে সেগুলোর প্রায় সবই বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ করেছে। আমরা তাদের এই কাজে আনন্দিত।”

তিনি বলেন, “আমরা বার বার ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন তালিকা দিয়ে জানিয়েছে, কোন কোন সংগঠন ও ব্যক্তি তাদের প্লাটফরম ব্যবহার করে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, অপপ্রচার, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। কিন্তু তারা তো আমাদের কথা ততোটা আমলে নেয় না।”

“আমরা ফেসবুকের এই তালিকাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখব আরও কোনো সংগঠন জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, অপপ্রচার, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর সাথে লিপ্ত রয়েছে কি না,” বলেন ফারুক হোসেন।

ফেসবুকের ফাঁস হওয়া এই তালিকায় ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইনস এবং বর্তমানে নেদারল্যান্ডে নির্বাসিত এর প্রতিষ্ঠাতা জোসে মারিয়া সিজনের নাম রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া ভিত্তিক সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ইসলামিক স্টেট আদর্শের অনুসারী সন্ত্রাসী সানতোসোর (২০১৬ সালে নিহত) নামও।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন