সাম্প্রদায়িক হামলা: রংপুরে জেলে পাড়ায় আগুনের সূত্রপাত ‘ফেসবুক থেকে’

শরীফ খিয়াম
2021.10.18
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
সাম্প্রদায়িক হামলা: রংপুরে জেলে পাড়ায় আগুনের সূত্রপাত ‘ফেসবুক থেকে’ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ, মন্দিরসহ হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে । ১৮ অক্টোবর ২০২১।
[বেনারনিউজ]

রংপুরের একটি জেলে পাড়ায় সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নি সংযোগের ঘটনায় সোমবার দুপুরে ওই জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) বিপ্লব কুমার সরকারকে বদলি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

একই আদেশে ফেনীর এসপি খোন্দকার নুরুন্নবী এবং চট্টগ্রাম ও সিলেট মহানগর পুলিশের দুই উপ-কমিশনার (ডিসি) বিজয় বসাক ও সঞ্জয় সরকারকে বদলির কথাও জানানো হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয় এ সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে। 

ওই চার কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন এলাকাগুলোতে বৃহস্পতিবার থেকে রোববারের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছিল। 

এদিকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো। পাশাপাশি, ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর সাম্প্রতিক নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ধর্মীয় ও নাগরিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল। 

‘ফেসবুক থেকে সূত্রপাত’ রংপুরের হামলা 

একটি ফেসবুক পেজ থেকে কাবা ঘরকে অবমাননার অভিযোগে রোববার রাতে রংপুরের পীরগঞ্জ থানার রামনাথপুরের একটি জেলে পাড়ায় সংখ্যালঘুদের ২০-২৫টি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় হামলাকারীরা।

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘ভালবাসার প্রস্তাব’ নামে একটি ফেসবুক একাউন্টের প্রোফাইলে কাবা শরীফের ছবি ছিল। সেখানে করা একটি মন্তব্য থেকে ঘটনার সূত্রপাত।

ফেসবুকের ওই মন্তব্যটি জেলেপাড়ার পরিতোষ সরকার নামে এক তরুণ করেছেন, এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে হামলাকারীরা পরিতোষের পাড়ায় আক্রমণ করতে গিয়ে সেখানে পুলিশের উপস্থিতি দেখে পার্শ্ববর্তী আরেকটি পাড়ায় আক্রমণ করে বলে বেনারকে জানান সংশ্লিষ্টরা।

“রামনাথপুর ইউনিয়নের বড়ো করিমপুর গ্রামে দুটি জেলেপাড়া রয়েছে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই তরুণ যে পাড়ায় থাকতেন সেখানে মোট ৪০টি হিন্দু পরিবারের বাস,” বেনারকে বলেন পীরগঞ্জ পূজা উদযাপন কমিটির নেতা সন্তোষ সরকার।

তিনি জানান, পরিতোষের পাড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগে থেকেই অবস্থান নেওয়ায় “হামলাকারীরা গিয়ে পাশের একটি পাড়ায় আক্রমণ করে।”

“ওই পাড়ার ৬৬টি ঘরের মধ্যে ২০-২৫টি ঘর পুড়ে গেছে। সবগুলো পরিবারের মালামাল লুটপাট করা হয়েছে,” বলেন সন্তোষ সরকার।

এদিকে পরিতোষকে সোমবার রাতে সীমান্ত জেলা জয়পুরহাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন রংপুরের বিদায়ী এসপি বিপ্লব সরকার।

তিনি জানান, পরিতোষ জয়পুরহাটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পরিবারসহ পালিয়ে ছিলেন। তবে পরিতোষকে কোন মামলায় আটক করা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

‘ভালবাসার প্রস্তাব’ নামে ফেসবুক পেজে পরিতোষ কী মন্তব্য করেছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বেনারের পক্ষ থেকে পেজটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পেজটি এখন আর দেখা যাচ্ছে না। 

রোববার রাতে রংপুরে ৬৬টি হিন্দু পরিবার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় সোমবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত কোনো মামলা না হলেও ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বেনারকে জানান পীরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাহবুব।

“আমাদের অভিযান এখনো চলছে। পুলিশ বাদী হয়ে একাধিক মামলা দায়েরের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে,” বলেন তিনি। 

রংপুরের পীরগঞ্জ থানার রামনাথপুরের এই ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঢাকায় সাংবাদিকদের জানান, সেখানেও ফেসবুক থেকে ঘটনার সূত্রপাত, এক হিন্দু ছেলের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ‘কাবা শরীফ’ অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। 

গত বুধবার কুমিল্লায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে কোরান শরীফ পাওয়ার ঘটনায় শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক সংঘাতে চাঁদপুরে চারজন মুসলিম এবং নোয়াখালীতে দুজন হিন্দু মারা গেছেন। 

গত ছয় দিনে সারা দেশের “বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ কেন্দ্রিক অপ্রীতিকর ঘটনায়” সাড়ে চারশো সন্দেহভাজন আটক হয়েছেন বলে সোমবার রাতে এক বার্তায় জানিয়েছেন পুলিশ সদরদপ্তর। 

এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ৭১ টি মামলা দায়ের হয়েছে, এবং আরো কিছু মামলার ‘প্রক্রিয়া চলছে’ বলে গণমাধ্যমকে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও গণসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. কামরুজ্জামান। 

“এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪৫০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। অপরাধীদের গ্রেপ্তাররে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে,” বলেন মো. কামরুজ্জামান। 

এদিকে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) মন্দিরের ডাকে সোমবার ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। কয়েকটি হিন্দু সংগঠন এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়।

সমাবেশ থেকে “প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে হামলাকারীদের বিচার চাওয়া হয়,” বলে বেনারকে জানান বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মুখপাত্র পলাশ কান্তি দে। 

জাতিসংঘের আহ্বান

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো । হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার স্বাধীন তদন্তেরও আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার তিনি তাঁর টুইটে এই আহ্বান জানান। গত বুধবার কুমিল্লায় কোরান শরীফ অবমাননার অভিযোগে দেশের বিভিন্নস্থানে হামলার পর বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে মিয়া সেপ্পো প্রথম প্রতিক্রিয়া জানালেন। 

hindu-kolkata.jpg
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ, মন্দিরসহ হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলার প্রতিবাদে কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে ইসকনের সন্ন্যাসী ও ভক্তদের বিক্ষোভ। ১৭ অক্টোবর ২০২১। [বেনারনিউজ]

কলকাতায় বিক্ষোভ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় ও নাগরিক সংগঠনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হচ্ছে।

ভারতের জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ কমিটির পক্ষ থেকে রবি ও সোমবার রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ জানানো হয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়ে জেলা শাসকদের কাছে দেওয়া হয় স্মারকলিপি।

বিজেপির রাজ্য নেতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সাত বিধায়কের প্রতিনিধিদল কলকাতার পার্ক সার্কাসে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার তৌফিক হাসানের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবার আবেদন জানান। বিজেপি নেতারা একটি স্মারক লিপি ডেপুটি হাইকমিশনারের হাতে তুলে দেন। 

কলকাতা ইসকনের পক্ষ থেকেও বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। ইসকনের সন্ন্যাসী ও অনুরাগীরা প্ল্যাকার্ড ও মোমবাতি হাতে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে রোববার সন্ধ্যায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সোমবারও তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করেন।

ইতিমধ্যেই ইসকনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীরও এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানান ইসকন নেতৃবৃন্দ।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গ ইমাম অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে পূজার সময় সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টার ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে।

এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি মহম্মদ ইয়াহিয়া বেনারকে বলেন, “বিদ্বেষের বীজ বপন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্মগ্রন্থকে অবমাননার খবর রটানো হয়। আর এই প্ররোচনায় পা দিয়ে কিছু মানুষ নিজেদের ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থকে অপমান করেছে।”

“বাংলাদেশে যে অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে তার নিন্দা করি। তবে বাংলাদেশ সরকার যে এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে তা দেখে আমরা আশ্বস্ত,” এক প্রতিক্রিয়ায় বেনারকে বলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার।

তাঁর মতে, “মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীগুলিই, যাদের সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদের গভীর সখ্যতা, তাদের প্ররোচনাতে এ দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে।” 

কলকাতা থেকে তথ্য দিয়েছেন পরিতোষ পাল।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।