ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক মন্দায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ ও অস্থিরতা

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.05.16
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক মন্দায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ ও অস্থিরতা রাজধানী ঢাকার বাজারে বেড়েছে প্রায় সব পণ্যের দাম। মিরপুর-৬ নম্বর বাজারে পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য কিনছেন ক্রেতারা। ১৬ মে ২০২২।
[বেনারনিউজ]

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা মোকাবেলায় ইতিমধ্যে বিলাসদ্রব্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেয়া ও বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রাখাসহ বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সরকার।

সরকারি হিসেবে, সোমবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে একদিনে টাকার বড়ো ধরনের অবনমন হয়েছে, একদিনে ডলারের বিপরীতে ৮০ পয়সা দর হারিয়েছে টাকা। অন্যদিকে পুঁজিবাজার হারিয়েছে ১৩৪ পয়েন্ট দর, যা দুই শতাংশের কাছাকাছি।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও গমসহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগান বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিদিনই এর প্রভাব পড়ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। বেড়েছে ভোজ্যতেল, আটা, পেঁয়াজসহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম।

এই প্রেক্ষাপটে সোমবার জনগণকে খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য সম্পদ অপচয় বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এসডিজি বিষয়ক এক সম্মেলন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রথমে করোনাভাইরাস ও পরে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শুধু বাংলাদেশকে নয় সারা বিশ্বকে অনেকটা স্থবির করে দিয়েছে।”

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে।

সমস্যা রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সমস্যার অন্যতম কারণ রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ ব্যাপক বেড়ে যাওয়া বলে বেনারকে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার হবে। অন্যদিকে আমদানি হবে ৮৫ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের রেমিটেন্স দিয়ে আমরা আরও ২০ বিলিয়ন ডলার আনতে পারব। এরপরও বাণিজ্য ঘাটতি থাকবে ১৫ বিলিয়ন ডলার।”

অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, যেহেতু আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেহেতু টাকার বিপরীতে ডলারের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে আজকে ৯৫ টাকা হয়েছে যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেট অনুযায়ী ৮৬ টাকা।

“এভাবে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, পণ্যের দাম বাড়তেই থাকবে এবং এক পর্যায়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে,” বলেন তিনি।

সরকার বর্তমানে আমদানির যে লাগাম টেনে ধরেছে তা আরো আগে করা উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যেকোনোভাবেই হোক, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঠিক রাখতে হবে। অন্যথায় আমরা আগামী দুই বছরের মধ্যে বিপদে পড়ে যাব।”

ভোজ্য তেলের পর আটা

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও ইন্দোনেশিয়ার পামওয়েল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির পর এবার গম, আটা ও পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

ইউক্রেন-রাশিয়ার পর গম আমদানির অন্যতম উৎস ভারত গম রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এর সাথে সাথে বাড়তে শুরু করেছে গম ও আটার দাম।

গম ও আটার দাম গত দুই সপ্তাহে কেজি প্রতি বেড়েছে প্রায় ২০ টাকা।

কাওরান বাজার আটা ব্যবসায়ী ও খলিল আটা ঘরের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাফি সোমবার বেনারকে বলেন, তিনি প্রতি কেজি গম ৪৬ টাকায় বিক্রি করছেন এবং প্রতি কেজি গম ভাঙাতে ১০ টাকা নিচ্ছেন। সেই হিসাবে প্রতি কেজি আটার দাম পড়ছে ৫৬ টাকা।

“দুই সপ্তাহ আগেও ২৬ টাকা কেজি গম বিক্রি করেছি,” জানিয়ে তিনি বলেন, “ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়ার পর প্রতি কেজি গমের দাম বেড়েছে পাঁচ টাকা। প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে, দাম আরও বাড়বে।”

“আসলে দামের ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা আমদানিকারক ও বড়ো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়ে আসি। আমরা যেমন দাম দিয়ে কিনি সেই দামের সাথে লাভ যোগ করে বিক্রি করি,” বলেন শাফি।

ওই দোকানে আটা কিনতে আসা ক্রেতা মো. সেলিম বেনারকে বলেন, “এভাবে দাম বৃদ্ধি সত্যিই দুঃখজনক। ব্যবসায়ীরা কারসাজি করেই দাম বৃদ্ধি করছে।”

তিনি বলেন, “সারা বিশ্বে বাজারের প্রবণতা হলো দাম বাড়লে মানুষ জিনিস কেনা কমিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে মানুষ দাম বাড়লে জিনিস বেশি করে কেনে। অনেকেই মনে করে দাম আরও বাড়বে। আর সেকারণেই বিক্রেতারা দাম আরও বাড়িয়ে দেন।”

বগুড়ার নিশিতা ফ্লাওয়ার মিলসের সত্ত্বাধিকারী নাহিদুজ্জামান নিশাদ বেনারকে বলেন, “গম পাইকারি রেটে বিক্রি করছি ৪২ টাকা কেজি। এভাবে চলতে থাকলে প্রতি কেজি গমের দাম পড়বে ৫০ টাকা।”

বেড়েছে পেঁয়াজের দাম

আটার পাশাপাশি খুচরা ও পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দামও বেড়েছে।

সরকারি চাকরিজীবী ও শেরে বাংলা নগরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম সোমবার বেনারকে বলেন, “আমি গত দুসপ্তাহ আগে মানিকগঞ্জ যাওয়ার পথে রাস্তার ওপর বাজার থেকে ১৭ টাকা দামে প্রতি কেজি পেঁয়াজ কিনেছি। ঢাকায় সেই পেঁয়াজ ছিল ৩০ টাকা কেজি।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে ঢাকার মোহাম্মদপুর বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। এখন পেঁয়াজের ভরা মৌসুম। এর মধ্যেও কেন দাম বাড়বে?”

কাওরান বাজার পাইকারি বিক্রেতা নাবিল আহমেদ সোমবার বেনারকে বলেন, “গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। আজকে প্রতি পাল্লা (পাঁচ কেজি) ১৮০ টাকায় বিক্রি করছি।”

ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও কেন পেঁয়াজের দাম বাড়ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “পেঁয়াজের এলসি (আমদানিপত্র) বন্ধ আছে। সেকারণে বিদেশ থেকে আমদানি হচ্ছে না।”

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান সোমবার বেনারকে বলেন, বিশ্বে ইউক্রেন ও রাশিয়া সবচেয়ে বেশি গমের সরবরাহকারী দেশ। সেখানে যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, “ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে গম আমদানি করত বাংলাদেশ। সেখানে যুদ্ধ শুরু হলে আমরা ভারত থেকে গম আমদানি করছিলাম। এখন ভারতও রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে।”

গোলাম রহমান বলেন, “ব্যবসায়ীরা তো দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন না। তাঁরা সর্বোচ্চ লাভের চেষ্টা করবেন। সরকার যদি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করত তাহলে এই সমস্যা হতো না।”

সোমবার সাংবাদিকদের সাথে এক আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, সরকার টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি পরিবারকে স্বল্পমূল্যে তেলসহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিক্রি করবে।

তিনি বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া থেকে গম আমদানি বন্ধ হওয়ার পর ভারত থেকে গম আমদানি করা হয়। মন্ত্রী বলেন, ভারত গম রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরও সেখান থেকে গম ক্রয়ের চেষ্টা চলছে।

সোমবার ভারতীয় হাইকমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে এবং খাদ্য সংশ্লিষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গম রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ভারতের প্রতিবেশী ও যেসকল দেশের প্রকৃতই খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত সমস্যা রয়েছে তাদের সহায়তা করা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও পূর্বে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী গম সরবরাহ বন্ধ হবে না। ফলে ভারতের প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশ যাঁরা তাঁদের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতি বাস্তবায়ন করতে গম প্রয়োজন তাদের জন্য রপ্তানির এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন