বেনারনিউজের সাথে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার

আশীফ এন্তাজ রবি
2022.06.07
ওয়াশিংটন ডিসি
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বেনারনিউজের সাথে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসে বেনারনিউজের সাথে সাক্ষাৎকারে কথা বলছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ২ জুন ২০২২।
[লরেন কিম/রেডিও ফ্রি এশিয়া]

জলবায়ু, রোহিঙ্গা ও ইউক্রেন সংকট এবং র‍্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেনারনিউজের সাথে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত আলোচনা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

উচ্চ পর্যায়ের অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে গত ২ জুন ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসে তিনি এই সাক্ষাৎকারটি দেন।

সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

Shahriar Alam-2.jpeg
বন্যায় ডোবা ঢাকার রাস্তায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন একজন রিকশা চালক। ৪ জুলাই ২০২১। [এএফপি]

বেনারনিউজ: আজকের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কি জলবায়ু সংকট বিষয়ে আলোচনা হয়েছে?

শাহরিয়ার আলম: একটা বড়ো সময় জুড়ে আমরা ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়ে আলোচনা করেছি। ...জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে স্বাস্থ্যের একটা সরাসরি সম্পর্ক জড়িত।

আমরা বলেছি যে, আরো গভীরে গিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং বিভিন্ন ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসছে। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকখানি এগিয়েছে। আমরা সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দেখতে চাই।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ যে ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে আছে, যে ধরনের জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে আছে, এই সার্বিক বিষয়গুলো বাংলাদেশে (গবেষণা) করলে এটাকে অনেক জায়গায় রেপ্লিকেট করতে পারবেন। এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত একটি বিষয় যদি আমলে নেয়া হয়, তাহলে অনেক কিছুই কিন্তু একসাথে আমলে নেয়া হয়ে যায়।

এর পাশাপাশি আমরা আমরা সাধুবাদ জানিয়েছি যে বাইডেন এডমিনিস্ট্রেশন ক্লাইমেট চেঞ্জের ইনিশিয়েটিভে ফেরত এসেছে, যেটা থেকে ট্রাম্প এডমিনিস্ট্রেশন সরে গিয়েছিল, যা আমাদের জন্য অনেক হতাশার ছিল।

Shahriar Alam-3.jpeg
নৌবাহিনীর জাহাজে করে চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীর ভাসানচর যাচ্ছেন এক দল রোহিঙ্গা। ২৯ ডিসেম্বর ২০২০। [এপি]

রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার

বেনারনিউজ: রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেয়া উদ্যোগে কি বাংলাদেশ সন্তুষ্ট?

শাহরিয়ার আলম: না, আমরা সন্তুষ্ট নই। এটা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই। জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ হয়েছে। …আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দায়িত্বশীল রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান যেভাবে ভূমিকা রাখার প্রয়োজন বিভিন্ন সময়ে, তারা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সমস্যাটি এই জায়গায় এসেছে।

বেনারনিউজ: মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি কী? রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলোচনার কি কোনো অগ্রগতি আছে?

শাহরিয়ার আলম: তাদের সাথে এর মাঝে একাধিক বৈঠক হয়েছে। যেখানে অল্প সংখ্যক মানুষকে নিয়ে যাওয়ার একটা আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু একটি পর্যায়ে গিয়ে আবার সেটা থেমে যাচ্ছে। এখানে একই কথা বারবার বলতে হয় দুঃখজনকভাবে, যে এখানে আলোচনার সত্যিকার অর্থেই সেরকম কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ইউএনএইচসিআর এবং আইসিআরসি, ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রসের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে, সুইজারল্যান্ডে গত সপ্তাহে। তারা (মিয়ানমারে) কিছুটা কাজ শুরু করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের কোনো অগ্রগতি জানানোর মতো কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

বেনারনিউজ: আপনি কি মনে করেন ইউক্রেন সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে সরিয়ে দিয়েছে?

শাহরিয়ার আলম: হতে পারে। সেই সম্ভাবনা আমরা কখনো একদম উড়িয়ে দেই না।

আজকেও কিন্তু রোহিঙ্গা বিষয়টি এসেছে। এটা এজেন্ডায় ছিল না। বাংলাদেশ এত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে সেটা উল্লেখ করে তারা ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় সিঙ্গেল কান্ট্রি হিসেবে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে আসছে। আমার মনে হয় না, যে অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অন্য কোনো ইস্যুর কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের সহযোগিতার যে ইতিহাস এবং বর্তমান যে কমিটমেন্ট সেখানে কোনো কিছু কমতি হবে।

শ্রীলংকা পরিস্থিতি ও চীনা ঋণ

বেনারনিউজ: গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটন ডিসির ইন্সটিটিউট অফ পিস এর এক আলোচনায় বলেছিলেন যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য চীন আসে ‘ঝুড়ি ভর্তি টাকা নিয়ে’। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বাংলাদেশকে ঋণের দায়ে জর্জরিত শ্রীলংকার পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে চীনের কাছ থেকে অত্যধিক ঋণ নেয়া দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

শাহরিয়ার আলম: মোটেই না। বাংলাদেশে অর্থনীতির যে ভিত্তি, যেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। বৈদেশিক ঋণের উপরে বেশি নির্ভরশীল হলে প্রথম যে ইন্ডিকেটরটি দেখতে হবে, সেটা হচ্ছে ডেবট টু জিডিপি। মানে ঋণের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ বাৎসরিক সম্পদ উৎপাদনের ক্ষমতা। সেই রেসিওর থ্রেসহোল্ড ফিগার ৭০ বা ৭৫ পার্সেন্ট এর ওপরে গেলে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। বাংলাদেশে তা বর্তমানে ৪২ পার্সেন্ট।

আরেকটি কারণ হলো, বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে আমাদের ডলার আহরণ – এটা বেশ তেজী ভাব আছে। ...এবং ফিউচার ফোরকাস্ট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কয়েক দিন আগেও বলেছে যে বাংলাদেশের ইকোনোমি ২০২৩ সালে ৭ পার্সেন্ট হতে পারে। সুতরাং দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির প্রশ্নই তো আসে না।

ইউক্রেন ওয়ার…। বাংলাদেশ তার খাদ্যে বেশিরভাগ দেশেই উৎপাদন করে। মাঝে মাঝে খুব সামান্য চাল আমাদেরকে আমদানি করতে হয়। গম কিছুটা আমদানি করতে হয়। কিন্তু সেই সক্ষমতাও আমাদের আছে। কারণ ডলার রিজার্ভ এখনো ওয়েল এবাভ ৪০ বিলিয়ন ডলার- ৪২ বা ৪৩ বিলিয়ন ডলার।

তো এই সার্বিক বিবেচনায় (ঝুঁকির) কোনো সম্ভাবনা নেই। শ্রীলংকা তো প্রশ্নই আসে না। … তবে একটা জিনিস সত্য, যে সব বড়ো রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আছে, সেই সব দেশের অর্থনৈতিক মন্দার একটা প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে। এর জন্য যে প্রয়োজনীয় ফিসক্যাল পলিসি নেওয়া দরকার সেটার রিফ্লেকশন আশা করি সামনের সপ্তাহে আপনারা জাতীয় বাজেটে দেখতে পাবেন।

অনেকেই ধরে নেয় পদ্মাসেতু বোধ হয় চীনের টাকায় তৈরি। …মূল পদ্মা সেতুতে চীনের এক পয়সাও বিনিয়োগ নেই। বাংলাদেশ সরকারের একক অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। কন্ট্রাক্টর আছেন চীনের। বাংলাদেশে আরো যে মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে তার একটি হলো মেট্রো রেল। এটাও চীনের বিনিয়োগ নয়, এটা জাইকা, জাপানের বিনিয়োগ। থার্ড টার্মিনাল অব শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, সেখানেও কিন্তু চীনের বিনিয়োগ নেই। আরেকটিতে আছে, কর্ণফুলী টানেল।

চীনের বিনিয়োগ থাকবে। যাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে, টেকনোলজি আছে এবং আরেকটি রাষ্ট্রকে সহায়তা করার মানসিকতা আছে, যে কোনো রাষ্ট্রই তাদের কাছে যাবে। তবে স্মরণ করিয়ে দেই, বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি চীনা বিনিয়োগ কিন্তু অন্যান্য দেশে আছে।

Shahriar Alam-5.jpeg
ঢাকায় দায়িত্বরত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন সদস্যরা। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮। [এপি]

র‍্যাবের ওপর অবরোধ

বেনারনিউজ: গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব) এর ওপর অবরোধ ঘোষণার পর থেকে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এটি কি অবরোধ আরোপের ফলাফল?

শাহরিয়ার আলম: আমি এটা মনে করি না। স্যাংশনটি যখন এসেছিল ডিসেম্বরে ৮/১০ তারিখের দিকে, আপনি তার আগেরও কয়েক মাসের পরিসংখ্যান যদি নেন, তবে একটি বড়ো ধরনের পরিবর্তন দেখবেন।

র‍্যাব কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, টেকনোলজিসহ অনেক কিছু সরবরাহ করেছে।

আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, যখন অভিযোগের বিষয়ে (র‍্যাবের ওপর) কিছুটা অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়েছিল, এর আগে এটা থেকে ওভারকাম করার জন্য ইন্টারনাল ম্যানেজমেন্টের যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছিল বা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেরকম একটা অবস্থায় কিন্তু তারা এই সিদ্ধান্তটি হঠাৎ করে নিয়েছে। যেটা আমরা অতীতেও বলেছি, এখনো মনে করি, এটা একটা ডিসপ্রোপোরশনেট রিঅ্যাকশন।

জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ দমনে র‌্যাব বিয়ন্ড বাংলাদেশ, বিয়ন্ড সাউথ এশিয়া, বিয়ন্ড এশিয়া। পৃথিবীতে যত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে র‌্যাব অন্যতম।

এখন যে কোনো ফোর্সেই এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যারা নিয়োজিত থাকে, বা যেসব ফোর্সের হাতে অস্ত্র থাকে, আমরা একেবারে রুল আউট করে দিতে চাই না যে, সেখানে ইন্ডিভিজুয়াল সিদ্ধান্তের কারণে বা কিছু ইন্ডিভিজুয়াল বিপথে না গেছেন বা ভুল না করেছেন বা প্রসিডিউরের বাইরে না গেছেন।

বেনারনিউজ: র‍্যাবের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো আশ্বাস কি পাওয়া গেছে?

শাহরিয়ার আলম: না, এরকম কোনো আশ্বাস আমরা পাইনি। …উই আর নট এক্সপেক্টিং এ সলুশন টুমরো। আমরা যেটা বলার চেষ্টা করছি, যে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এটা করা হয়েছে। এবং ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তারা যেন ভবিষ্যতে আর কোনো সিদ্ধান্ত না নেন।

এ কারণে আমরা কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। …সব জায়গায় যেন সঠিক তথ্যটি যায়। এটার জন্য খুব কনশাসলি এনগেজড আছি। কিন্তু আনফরচুনেটলি খুব টিডিয়াসলি শ্লো। যেখানে আমাদেরকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।