ইসরায়েল থেকে আড়িপাতা প্রযুক্তি কেনা নিয়ে নানা প্রশ্ন

নাজমুল আহসান
2023.01.14
অকল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ইসরায়েল থেকে আড়িপাতা প্রযুক্তি কেনা নিয়ে নানা প্রশ্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে ঢাকায় নিজের মোবাইল ফোনে সংবাদ পড়ছেন এক বাংলাদেশি নাগরিক। ২০ ডিসেম্বর ২০১৮।
[এপি]

ইসরায়েল-সম্পৃক্ত কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকার অত্যাধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম কিনেছে বলে সম্প্রতি এক সংবাদে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ। এর ফলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং এই প্রযুক্তির রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর আগেও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাংলাদেশের গণ-নজরদারি সরঞ্জাম কেনার সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এবার হারেৎজ তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ ডলারের চারটি নতুন ক্রয়চুক্তি সম্পাদনের তথ্য প্রকাশ করেছে।

স্বাধীন ফিলিস্তিন দাবির সমর্থক বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার বাংলাদেশ এখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি, ইসরায়েল থেকে বাংলাদেশে আমদানিও নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ সরকার হারেৎজ এর প্রতিবেদনের বক্তব্য সরাসরি অস্বীকার করেনি। তবে নজরদারি সরঞ্জাম ‘সরাসরি’ ইসরাইল থেকে কেনা হয়নি বলে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

‘সোশ্যাল মিডিয়া নজরদারি’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বৃহস্পতিবার সংসদে বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নজরদারির মাধ্যমে দেশ ও সরকার বিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধের জন্য ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার- এনটিএমসিতে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজিত হয়েছে। একই সঙ্গে আইনসম্মতভাবে মুঠোফোন ও ইন্টারনেট মাধ্যমে যোগাযোগে আড়ি পাতার ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”

তবে কোন দেশ থেকে প্রযুক্তিগুলো কেনা হয়েছে সে বিষয়ে কিছু জানাননি তিনি।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, “সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অনুপস্থিতিতে এমন প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যক্তিগত তথ্য ও যোগাযোগের গোপনীয়তা, সুরক্ষা এবং বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ একাধিক সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার খর্ব হওয়ার ব্যাপক ঝুঁকি হবে।”

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কারো বিরুদ্ধে সাইবার নজরদারি পরিচালনার জন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আদালতের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয় না।

গত কয়েক বছর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ক্ষমতাসীন মহল এ ধরনের নজরদারির প্রযুক্তি যথেচ্ছ ব্যবহার করছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা, বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানহানিসহ সংবিধানে নিশ্চিত করা অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।”

এ প্রসঙ্গে নরওয়ের অসলো ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষক মুবাশ্বার হাসান বেনারকে বলেছেন, “অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যারের ব্যাপক কেনাকাটা দেখে বোঝা যায়, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় গোয়েন্দারা বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর নজরদারিতে কতটা মরিয়া।”

“বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী সরকারগুলো বিরোধী দলকে দমন করতে স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে। বাংলাদেশ সরকার তাদের থেকে ভিন্নভাবে কাজ করবে এমন কোনো আলামত নেই,” বলেন তিনি।

সম্প্রতি কেনা আড়িপাতার সরঞ্জামগুলোর মধ্যে এমন একটি ‘স্পাই ভ্যান’ রয়েছে যা একটি নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তাও ধরতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।

এই প্রযুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রুস স্নাইয়ার বেনারকে বলেছেন, মেসেজিং অ্যাপের এনক্রিপশনের চেয়ে ব্যবহারকারীদের নিজেদের ডিভাইসেই দুর্বলতা বেশি থাকে।

“আমরা যতদূর জানি হোয়াটসঅ্যাপ এবং সিগন্যাল নিরাপদ। কিন্তু আপনার ফোনটি নিরাপদ নয়। তাই, আমি যদি আপনার ফোন হ্যাক করে আপনার স্ক্রিন পড়ি, তাহলে আমি আপনার হোয়াটসঅ্যাপ এবং সিগন্যালের বার্তাগুলোও পড়তে পারব। আমি কোনো মেসেজিং প্রোগ্রাম হ্যাক না করেও এই কাজ করতে পারব,” বলেন তিনি।

এর আগে একটি সুইস কোম্পানির কাছ থেকে মোবাইল রিসেপ্টর টুল কেনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বেনারনিউজ। হারেৎজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সুইস কোম্পানিটি আসলে একটি সাইপ্রাস-ভিত্তিক ইসরায়েলি সরবরাহকারীর সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছিল।

02.JPG
তেল আবিবের নিকটবর্তী হার্জলিয়ায় ইসরায়েলি সাইবার প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ এর কার্যালয়ের বাইরে নজরদারি ও নিপীড়ন বিরোধী ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে কয়েকজন প্রতিবাদকারী। ২৫ জুলাই ২০২১। [রয়টার্স]

দেশে দেশে ইসরায়েলি প্রযুক্তির চাহিদা

প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার দেশ ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নজরদারি শিল্পের দেশগুলোর একটি। দেশটির রয়েছে অতি শক্তিশালী গোয়েন্দা প্রযুক্তি।

মানবাধিকারের প্রতি কম শ্রদ্ধাশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েল ভিত্তিক সাইবার-নিরাপত্তা সংস্থা এনএসও গ্রুপের মারাত্মক শক্তিশালী স্পাইওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে – এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সম্প্রতি কোম্পানিটি বিশ্বব্যাপী মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

তবে সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো ক্রেতা টানতে দ্বিধা করে না।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষক এবং ইসরায়েলের নজরদারি প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ে প্রকাশিতব্য একটি আলোচিত বইয়ের লেখক অ্যান্টনি লোয়েনস্টেইন বেনারকে বলেছেন, “বাংলাদেশের কাছে ইসরায়েলের নজরদারি সরঞ্জাম বিক্রির সাম্প্রতিক খবরগুলো এই বৈশিষ্ট্যেরই ধারাবাহিকতা। ইসরায়েলের অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং ইহুদি রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের শাসকরা স্বৈরশাসক কিনা তা প্রাসঙ্গিক নয়।”

এর আগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের দুর্নীতির ওপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আল জাজিরার একটি ডকুমেন্টারিতেও দেখানো হয়েছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হাঙ্গেরির মাধ্যমে ইসরায়েলে তৈরি সাইবার টুল ক্রয় করেছিল।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের কাছে প্রতিরক্ষা সামগ্রী রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল কিনা তা জানতে চাইলে তারা হারেৎজকে কোনো জবাব দেয়নি।

“ইসরায়েলি অস্ত্র নিয়মিতভাবে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইসরায়েলের এসব বিষয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ নেই," বলেন লোয়েনস্টাইন।

বাংলাদেশের পাসপোর্টে আগে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ পৃথিবীর সব দেশে ভ্রমণ করা যাবে বলে ঘোষণা লেখা থাকত। গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ পাসপোর্ট থেকে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ কথাটি বাদ দেয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা একে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

তবে বাংলাদেশ সরকার এখনও জোর দিয়ে বলছে ইসরায়েলের ব্যাপারে তাদের নীতি পরিবর্তন হয়নি। ইসরায়েলকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও কমেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর কয়েকদিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে ইসরায়েলি নাগরিক সমাজের নেতা মেন্ডি এন সাফাদির সাথে দেখা করেছেন বলে সরকার সমর্থকদের অভিযোগ ও সমালোচনার মুখে পড়েন। যদিও নূর এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা দাবি করেন, সাফাদি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট এবং তিনি বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য নূরের সাথে কাজ করছেন।

২০১৬ সালের মে মাসে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী ভারতে একটি অনুষ্ঠানে সাফাদির সাথে দেখা করার অভিযোগে তাঁকে “রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের” জন্য কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

এর এক মাস পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন মোসাদ এবং বিএনপির ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলাদেশে জিহাদি হামলা হয়েছিল। তবে ইসরায়েল এ ধরনের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিল।

কয়েক দিন আগে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের ওই মামলায় আসলাম চৌধুরীকে দেওয়া নিম্ন আদালতের দেওয়া জামিন বাতিল করেছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।