প্রবাসী নারীর পরিবারকে সমাজচ্যুতির ঘোষণা: প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ক্ষমা চেয়েছে মসজিদ কমিটি

আহম্মদ ফয়েজ
2022.02.02
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
প্রবাসী নারীর পরিবারকে সমাজচ্যুতির ঘোষণা: প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ক্ষমা চেয়েছে মসজিদ কমিটি নিজের মোবাইলে ফোনে প্রবাসী নুরুননাহার চৌধুরী ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত করা সংক্রান্ত সংবাদ পড়ছেন ঢাকার একজন পাঠক। ২ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
[বেনারনিউজ]

উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করার প্রেক্ষিতে মসজিদ কমিটির মাধ্যমে ‘সমাজচ্যুতির’ শিকার হয়েছে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার একটি পরিবার। এই ঘটনায় পরিবারটির অভিযোগ আমলে নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিষয়টি আপাতত সমাধান হলেও ভয় কাটেনি পরিবারের।

সম্প্রতি উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন কুলাউড়া উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হাই চৌধুরীর বড়ো মেয়ে নুরুননাহার চৌধুরী ঝর্ণা। যিনি ‘পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ’ নামে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়কেরও দায়িত্ব পালন করছেন।

“আমার ধারণা নারী অধিকার নিয়ে এবং প্রগতিশীলতার চর্চা করার কারণেই আমি উগ্র মৌলবাদীদের আক্রোশের শিকার,” যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেলিফোনে বেনারকে বলেন ঝর্ণা।

তিনি বেনারকে জানান, সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক পাস করে গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে যান তিনি।

“আমার সংগঠনের চেয়ারম্যান ও আমার শিক্ষক জয়তূর্য চৌধুরীও যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। আমার স্যার আমাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান এবং তিনি আমদের সে সময়কার একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন,” বলেন ঝর্ণা।

একটি জিন্সের প্যান্ট, একটি শার্ট ও ওভারকোট পরিহিত ওই ছবি নিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে লোকেরা নানা মন্তব্য করতে শুরু করে এবং তা থেকেই ঘটনার সূত্রপাত হয় বলে জানান ঝর্ণা।

এই ছবিটিকে নিয়ে এলাকার কিছু মানুষ আপত্তিকর মন্তব্য করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে স্থানীয় ভাটেরা বাজার জামে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা তাঁর পরিবারকে নানা ভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন বলে অভিযোগ ঝর্ণার।

তিনি বলেন, “এরপর ২৮ জানুয়ারি পঞ্চায়েতের সভায় আমাদের পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেয়া হলে আমার বাবা আবদুল হাই চৌধুরী উপজেলা প্রশাসনের কাছে বিচার দেন।”

এ প্রসঙ্গে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “ওই ঘটনায় নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছে স্থানীয় মসজিদ কমিটি এবং ভবিষ্যতে পরিবারটিকে কোনো প্রকার হয়রানি করা হবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “ভিকটিম পরিবারটিও এই সমাধানে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে যেন কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না হয় সে বিষয়ে আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি।”

“মাসুম নামে এক যুবক শুরুতে এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে, সেই যুবকও পরিবারটির কাছে ক্ষমা চেয়ে এসেছে,” বলে ইউএনও দাবি করলেও ঝর্ণার ছোট বোন তামান্না চৌধুরী বেনারকে বলেন, “এটা ঠিক মাসুম আমাদের বাসায় এসেছে, কিন্তু সে আমাদের কাছে ক্ষমা চায়নি।”

তিনি বলেন, “আমার বোন এবং আমাদের পরিবার এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুলিং বা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে। আমাদের পরিবার মাসুমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে চিন্তা করছে।”

ঝর্ণার শিক্ষক জয়তূর্য চৌধুরী তাঁদের এই ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করার পর থেকেই ঝর্ণার পোশাক নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় বলে বেনারকে জানান ঝর্ণা। [সৌজন্যে: নুরুননাহার চৌধুরী ঝর্ণা]
ঝর্ণার শিক্ষক জয়তূর্য চৌধুরী তাঁদের এই ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করার পর থেকেই ঝর্ণার পোশাক নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় বলে বেনারকে জানান ঝর্ণা। [সৌজন্যে: নুরুননাহার চৌধুরী ঝর্ণা]

থমকে যেতে পারে সাংগঠনিক কার্যক্রম

যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেলিফোনে বেনারের সাথে কথা বলেন ‘পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ’ নামের সংগঠনটির চেয়ারম্যান জয়তূর্য চৌধুরী।

তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের ১৭টি জেলায় নারীদের অধিকার এবং স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করি। এই ঘটনার ফলে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা বিভিন্ন স্থানে বাঁধার মুখে পড়তে পারে বলে আমাদের আশংকা।”

তিনি বলেন, “অরাজনৈতিকটা, অসাম্প্রদায়িকতা, নারী স্বাধীনতা, মাদকমুক্ততা, প্রগতিশীলতা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে আমরা কাজ করি।”

কুলাউড়া এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আগে থেকেই বাধা পেয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ করে জয়তূর্য বলেন, “ঝর্ণার পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের স্বেচ্ছাসেবীদের আতঙ্কিত করে তুলতে পারে।”

এ প্রসঙ্গে ঝর্ণা বলেন, “আমার ধারণা ছবিটিকে শুধুমাত্র একটি ইস্যু বানিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়ে আমাদেরকে মূলত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকার হুমকি দেওয়া হলো।”

তিনি বলেন, “যদিও আমার পরিবার সাময়িকভাবে একটা প্রতিকার পেয়েছে, আমার এবং আমার পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুলিং কিন্তু থেমে নেই। এটা আমাকে মানসিকভাবে খুবই আহত করছে।”

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হারুন-অর-রশীদ বেনারকে বলেন, “মসজিদ কমিটি বা স্থানীয় পঞ্চায়েতের এমন কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজে এখন আর তেমন একটা নেই বললেই চলে। এই সময়ে এসে এমন ঘটনা সত্যিই হতাশাজনক।”

তিনি মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সাধুবাদ পেতে পারে। কিন্তু পরিবারটি যদি আইনি পদক্ষেপ নিতে চায়, সে ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।

“পরিবারটি যেহেতু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো হয়রানির শিকার হচ্ছে, অবশ্যই তাঁরা এর প্রতিকার এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে, এটা তাদের অধিকার,” বলেন হারুন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন