বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশিদারিত্ব সংলাপ: র‌্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ওঠার আশ্বাস মেলেনি

জেসমিন পাপড়ি
2022.03.21
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশিদারিত্ব সংলাপ: র‌্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ওঠার আশ্বাস মেলেনি অষ্টম অংশিদারিত্ব সংলাপ শেষ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন রাজনীতিবিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড (ডানে) এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। ২০ মার্চ ২০২২।
[সৌজন্যে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়]

র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে গত তিন মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড।

তবে র‍্যাবের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশের দাবির প্রেক্ষিতে কোনো আশ্বাস মেলেনি তাঁর কাছ থেকে। বরং বিষয়টি ‘জটিল ও কঠিন’ উল্লেখ করে এই বিষয় নিয়ে আরও কাজ করার আছে বলে জানান তিনি।

পাশাপাশি, মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র চুপ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড।

রোববার ঢাকায় দুদেশের মধ্যে অষ্টম অংশীদারিত্ব সংলাপের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, “এটা নিঃসন্দেহে আজকের আলোচনার জটিল ও কঠিন বিষয়। আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করেছি।”

“আপনারা জানেন, র‌্যাবের কার্যক্রম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি, গত তিন মাসে এসব বিষয় প্রতিকারের ক্ষেত্রে আমরা উন্নতি লক্ষ্য করেছি, যা পররাষ্ট্র সচিব মোমেন আজ খোলাসা করেছেন,” যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমরা সরকারের পরিকল্পনাসহ একটি প্রতিবেদন পেয়েছি এবং এসব বিষয়ে কাজ করতে চাই। কারণ নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আমাদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।”

র‌্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবত রেখে দুদেশের সম্পর্ককে বিস্তৃত করা কীভাবে সম্ভব, এমন প্রশ্নের উত্তরে “এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে” জানিয়ে নুল্যান্ড বলেন, “কারণ আইনশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আমাদের অব্যাহত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।”

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, “বৈঠকে উভয়পক্ষ কিছু বিষয়ে একে অপরকে ভালোভাবে বোঝা এবং নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেয়েছে। যেমন, র‌্যাবের ও তার সংশ্লিষ্টদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ জানিয়েছি।”

“আমরা ব্যাখ্যা করেছি কীভাবে এই নিষেধাজ্ঞা সরকারের সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ মোকাবেলা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং পাশাপাশি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগের বিষয়েও বিস্তারিত জানিয়েছি। এক্ষেত্রে আলোচনা অব্যাহত রাখতে চাই আমরা,” বলেন তিনি।

“র‌্যাব ও এর কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাদের নেওয়া কিছু উদ্যোগের বিষয় উল্লেখ করে আমরা একটি নন-পেপার ডোশিয়ার হস্তান্তর করেছি। তারা এটা নিয়ে যাবে এবং দেখবে। বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব এবং আশা করি এই বিষয়টা সময়মত সমাধান হবে,” বলেন পররাষ্ট্র সচিব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বেনারকে বলেন, এই সংলাপের ধারাবাহিকতায় হয়তো “আগামীতে যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।”

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর জেনোসাইডের গবেষণা তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. ইমতিয়াজ বলেন, “মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কিছুদিন আগে থেকেই দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমে আসতে শুরু করে। কারণ বাংলাদেশের মধ্যেই এ নিয়ে বড়ো সমালোচনা আছে এবং অনেক স্টেক হোল্ডার এটা নিয়ে কাজ করছে।”

আইপিএসে বাংলাদেশকে চায় যুক্তরাষ্ট্র

বেশ কয়েকবছর ধরে নানা পর্যায়ের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর কৌশলে (আইপিএস) যুক্ত হওয়ার কথা বলে আসছে। সোমবারের সংলাপে এর পুনরাবৃত্তি হয়।

মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, “আইপিএসে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত উপাদান আছে এবং আমরা খুশি হবো বাংলাদেশ যেভাবে চায় সেভাবে এখানে অংশগ্রহণ করুক। আমরা মনে করি—এক সঙ্গে সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যায়। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুধু নয়, এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিয়েও সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সম্ভব।”

বাণিজ্য-ব্যবসা এবং প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র আরো অনেক কাজ করতে পারে বলেও জানান ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড।

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর কৌশল সম্পর্কে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ তুলে ধরেছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, “অবাধ ও মুক্ত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের কথা জানান মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি। মাসুদ বিন মোমেন এ সময় আইপিএসে অর্থনৈতিক গুরুত্বারোপ করেন। এর প্রেক্ষিতে ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড জানান, আইপিএসে অর্থনৈতিক কাঠামো আছে, এর ঘোষণাও শিগগির আসবে।”

এ প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ বলেন, “আইপিএসে অর্থনৈতিক উপাদান থাকলে বাংলাদেশ সেখানে থাকতে পারে। তবে সেটা যদি সামরিক কাঠামো হয় তাহলে বাংলাদেশ সেখানে স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহ দেখাবে না,” বলেন

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, “রাশিয়া ইউক্রেনে যে আগ্রাসন চালিয়েছে, তাতে বিশ্বে আইনের শাসন, মানবতা ও গণতন্ত্র হুমকিতে পড়েছে। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে এই গণতন্ত্র ও মানবতা রক্ষার লড়াইয়ে বাংলাদেশকে পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র।”

অস্ত্র চুক্তি

কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র কিনতে দুই দেশের মধ্যে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিসোমিয়া) ও অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্টের (আকসা) সই নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, “বৈঠকে চুক্তির একটি খসড়া বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তি হলে নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমরা অনেক কিছু করতে পারব।”

এই অংশীদারিত্ব সংলাপটি প্রকৃতপক্ষে বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে প্রথম এবং আসন্ন মাসগুলোতে নির্ধারিত সংলাপের একটি সিরিজের মধ্যেও প্রথম উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রসচিব। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন আগামী ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন বলে জানান তিনি।

“বৈঠকে দুপক্ষই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সহযোগিতার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে, জুনের শুরুতে অর্থনৈতিক অংশীদারি পরামর্শ এবং টিকফার পরবর্তী রাউন্ডে আরও আলোচনা হবে,” বলেন তিনি।

বৈঠকে গণতান্ত্রিক চর্চা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শ্রম অধিকার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির মতো বিষয়েও আমরা আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় এবং ব্লু ইকোনমিতে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও গভীর আলোচনা হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্র সচিব।

অষ্টম অংশীদারিত্ব সংলাপে যোগ দিতে গত শনিবার একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় আসেন ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড। সোমবার ঢাকা ছাড়েন তিনি।

২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ওয়াশিংটনে প্রথম অংশিদারিত্ব সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে দুই বছর বিরতির পর এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো। আগামী বছর নবম সংলাপ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন