শাহজাহান বাচ্চু হত্যা: জেএমবি সম্পৃক্ততার সন্দেহ
2018.06.25
ঢাকা
মুক্তমনা কবি ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু হত্যায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।
তদন্তের সূত্র ধরে গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের পৌরসভার মাওনা এলাকায় পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার রফিকুল ইসলামের বাড়ির নিচতলায় গড়ে ওঠা এক জঙ্গি আস্তানায় রোববার ভোরে অভিযান চালানো হয়েছে।
সেখানে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ও চারটি বোমাসহ এক জঙ্গি দম্পতি আটকের একদিন পরও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ।
পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সহেলী ফেরদৌস সোমবার বেনারকে বলেন “এখনই আমরা কিছু জানাচ্ছি না। কারণ অপারেশন শেষ হয়নি।”
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম সবুর বলেছিলেন, “বিষয়টি স্পর্শকাতর। অভিযান বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বক্তব্য দেবে।”
জঙ্গি দমনে গঠিত পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং ল’ফুল ইন্টারসেপশন সেলের (এলআইসি) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিট (সিটিটিসি) এবং স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে এই অভিযান চালায়।
কালিয়াকৈর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শাহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অভিযানে আটক আবদুর রহমান (৩০) পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার জাকিয়াপাড়া গ্রামের মো. হোসেন আলীর ছেলে। তার স্ত্রী শামসুন্নাহার (২৮) একই উপজেলার কালীগঞ্জ গ্রামের মো. ফজলুল হকের মেয়ে।
পঞ্চগড়ে জেএমবি’র টার্গেট হন বাচ্চু
এলআইসি ও সিটিটিসি’র বরাত দিয়ে ঢাকার একাধিক গণমাধ্যম বলেছে, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় শাহজাহান বাচ্চু ‘শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। সেখান থেকেই জেএমবি সদস্যরা তাঁকে টার্গেট করে।
বাচ্চুর কন্যা দূর্বা জাহান বেনারকে বলেন, “শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র মূলত কয়েকটি রুম নিয়ে আশ্রমের মতো একটা লাইব্রেরি, ২০১৫ সালে বাবা ওটা করেছিলেন। নিভৃতে থাকা-খাওয়া আর বই পড়ার ব্যবস্থা ছিল সেখানে।”
“এই কেন্দ্র নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল বাবার। এ নিয়ে অনেকবার আলাপ হয়েছে আমার সাথে,” উল্লেখ করেন তিনি।
বাচ্চু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হেলাল উদ্দিন বেনারকে বলেন, “পঞ্চগড়ের বিহারি অধ্যুষিত ওই এলাকাটি অনেক আগে থেকেই জঙ্গিদের আড্ডা-আস্তানা হিসেবে পরিচিত।”
সন্দেহ তালিকায় এবিটিও
এর আগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে লেখালেখির কারণেই শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহ করেছিল পুলিশ। গত ১৫ জুন সিসিটিসি’র প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, “জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) বা আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা এই হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকতে পারে।”
পরে বগুড়া জেলা পুলিশের সহায়তায় এলআইসি ও সিটিটিসি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পুরোনো জেএমবি’র সংশ্লিষ্টতার তথ্য পায়। সেই সূত্র ধরেই রোববার ভোরে গাজীপুরে অভিযান চালানো হয়।
“গ্রেপ্তারকৃতরা শাহজাহান বাচ্চু হত্যায় জড়িত থাকলে অবশ্যই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে তারা আমাদের (পুলিশের) কোন ইউনিটের কাছে আছে তা এখনো জানতে পারা যায়নি,” সোমবার দুপুরে বলেন পরিদর্শক হেলাল।
একই সময়ে ‘কিছু জানাতে’ অপারগতা প্রকাশ করেন এআইজি সহেলী। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে বলার সময় হয়নি।” আর দূর্বা বলেন, “কাউকে গ্রেপ্তার করার কথা আমাদের (বাচ্চুর পরিবারকে) জানায়নি পুলিশ; তদন্ত চলছে এটুকুই জানি।”
উল্লেখ্য, গত ১১ জুন সন্ধ্যায় সিরাজদিখানের নিজ গ্রামে দুর্বৃত্তের প্রকাশ্য গুলিতে নিহত হন শাহজাহান বাচ্চু। দু’টি মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে হত্যা করে দ্রুত পালিয়ে যায় চার খুনি।
বাসা ভাড়া নেওয়া হয় ড্রাইভার পরিচয়ে
জঙ্গি আস্তানার বাড়ির মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, নিজেকে ড্রাইভার হিসেবে পরিচয় দিয়ে আবদুর রহমান প্রায় দুই মাস আগে স্ত্রীসহ এসে সাড়ে তিন হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন।
মালিকের ছোট ভাই বাচ্চু মিয়া জানান, তারা আশপাশের লোকজনকে এড়িয়ে চলতেন। কারও সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতেন না। নিঃসন্তান ওই দম্পতির দুই মাস বয়সী একটি পালিত কন্যা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন আগে মারা যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিসিটিসি’র একাধিক কর্মকর্তা বেনারকে জানান, অনেক দিন ধরেই পুরোনো জেএমবি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে আসছে। বগুড়া ও রাজশাহীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।