খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ফখরুল কয়েকঘন্টা জেলে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.03.30
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
160330-BD-khaleda-620.jpg খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও মির্জা ফখরুলকে জেলে পাঠানোর প্রতিবাদে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। ৩০ মার্চ ২০১৬।
ফোকাস বাংলা

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। অবরোধের মধ্যে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বাসে পেট্রল বোমা মেরে মানুষ হত্যার ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় এই পরোয়ানা জারি হয়।

এদিকে পাঁচ বছর ‘ভারপ্রাপ্ত’ থাকার পর গতকাল বিএনপির মহাসচিব হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে বুধবার বেলা সোয়া ১১টায় যখন তাঁকে মহাসচিব ঘোষণা করা হয়, তখন তিনি ছিলেন আদালতে। এরপর প্রায় ছয় ঘণ্টা হাজতখানা, কেন্দ্রীয় কারাগার হয়ে সন্ধ্যায় জামিনে মুক্তি পান নতুন মহাসচিব।

দলের শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে এসব মামলাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করেছে বিএনপি। দলটির নেতারা খালেদা জিয়া ও মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ এবং সাম্প্রতিক সময়কার কিছু ঘটনা থেকে জনদৃষ্টি ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা বলে মনে করছেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ছয়টি; হত্যা, বিস্ফোরক ও নাশকতার অভিযোগে তিনটি; রাষ্ট্রদ্রোহের একটিসহ ১৩টি মামলা রয়েছে।

এর মধ্যে দুদকের করা জিয়া চ্যারিটেবল, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট-সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। নাইকো ও গ্যাটকো দুর্নীতির মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় বিচার শুরু হয়েছে।

গুলশানে নিজের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে গত বছর ৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়া লাগাতার হরতাল ও অবরোধের ডাক দেন।  এই কর্মসূচি চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রল বোমা হামলা শুরু হয়।

ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বুধবার পুলিশের  অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা। পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করা গেল কি না—তা পুলিশকে ২৭ এপ্রিল জানাতে নির্দেশ দেন তিনি।

“গতকাল অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে আদালত খালেদা জিয়াসহ পলাতক ২৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন মতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।এ মামলায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে,” বেনারকে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাপস কুমার পাল।

“আদালতে সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। আদালত তা নাকচ করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন,” বেনারকে জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার।

খালেদা জিয়া আত্মসমর্পণ করবেন কি না, জানতে চাইলে ওই আইনজীবী বলেন, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁর বিরুদ্ধে যত মামলা আছে, সবগুলোতে তিনি হাজির হয়েছেন।

খালেদা জিয়া ছাড়া এ মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন ভারতে আটক বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদ, যাত্রাবাড়ীর সাবেক সাংসদ সালাউদ্দিন আহমেদ, তার ছেলে তানভীর আহমেদ, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাংবাদিক  নেতা শওকত মাহমুদ, বিএনপি সমর্থক শিক্ষক নেতা সেলিম ভূঁইয়া, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার নবীউল্লাহ নবী, ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আজিজুল বারী হেলাল, ছাত্রবিষয়ক সহসম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রমুখ।

হুকুমের আসামি করে মামলা

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে গত বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধের ডাক দেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।এই অবরোধের মধ্যে ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রলবোমা ছোড়া হলে ২৯ জন যাত্রী দগ্ধ হন।

তাঁদের মধ্যে নূর আলম (৬০) নামের এক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ ফেব্রুয়ারি মারা যান। ওই ঘটনায় ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে দুটি মামলা করে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ, যাতে অবরোধ আহ্বানকারী বিএনপি চেয়ারপারসনকে করা হয় হুকুমের আসামি।

এর মধ্যে এক মামলায় আনা হয় হত্যার অভিযোগ, অন্যটি করা হয় বিশেষ ক্ষমতা আইনে।

তদন্ত শেষে গোয়েন্দা পুলিশ গত বছরের ৬ মে হত্যা মামলায় এবং ১৯ মে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

গতকাল আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ২৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। বাকি ১০ জনের মধ্যে ছয়জন জামিনে এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন। অভিযোগপত্র থেকে বিএনপির নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়াসহ ৩১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

মহাসচিব হয়েই কারাগারে, অতঃপর মুক্তি

অবশেষে বিএনপির মহাসচিব হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বুধবার সোয়া ১১টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির চেয়ারপারসনের পক্ষে দলের দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তাঁকে মহাসচিব ঘোষণা করেন।

১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনের ১১ দিন পর এ সংবাদ সম্মেলন বিএনপির মহাসচিব ছাড়াও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও কোষাধ্যক্ষের নাম ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রুহুল কবির রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মিজানুর রহমান সিনহা কোষাধ্যক্ষ মনোনীত হয়েছেন।

গতকাল মহাসচিব ঘোষণার ঘণ্টাখানেকের মাথায় নাশকতার দুটি মামলায় আদালত মির্জা ফখরুলকে কারাগারে পাঠান। এতে নেতা-কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

বিকেলে মির্জা ফখরুলকে কারাগারে পাঠানোর খবর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছালে রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে আসে।

মিছিল শেষে দ্বিতীয় দফায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিএনপির নবনিযুক্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী দলের নতুন মহাসচিবকে (মির্জা ফখরুল) কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে সরকারের ‘গভীর ষড়যন্ত্রের’ অংশ বলে মন্তব্য করেন।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর পল্টন থানার তিনটি নাশকতার মামলায় গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মহানগর হাকিম গোলাম নবী শুনানি শেষে দুপুরে এক মামলায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। বাকি দুটিতে জামিনের আবেদন নাকচ করে আদালত বেলা ১টার দিকে ফখরুলকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালতের আদেশের পর পরই মির্জা ফখরুলকে এজলাস থেকে প্রথমে কোর্ট হাজতখানায়, এর পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে মির্জা ফখরুলের আইনজীবীরা একই আদালতে জামিন আবেদন পুনঃ বিবেচনার জন্য আবেদন জানান। আবার শুনানি শেষে বিকেল চারটার দিকে আদালত অসুস্থতা বিবেচনায় তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

সন্ধ্যা সাতটায় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান বিএনপির নবনিযুক্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। এ সময় তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগমসহ দলের নেতা-কর্মীরা তাঁকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা লুট, বাংলাদেশের কার্গো বিমান পরিবহনে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা, কলেজছাত্রী তনু হত্যার প্রতিবাদে যাতে কেউ দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য সরকার একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে।

অবশ্য সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান, এটা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া। এখানে রাজনীতির কিছু নেই।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।