সমীক্ষা বলছে সপ্তাহে ৬৪ ঘণ্টা কাজ করে ঢাকার শিশুরা, সরকারের নাকচ

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.12.08
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেও কাজ করে এসব শিশু শ্রমিকরা। চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেও কাজ করে এসব শিশু শ্রমিকরা। জুলাই ৭, ২০১৬।
স্টার মেইল

বাংলাদেশে শিশুশ্রম অবৈধ হলেও রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাসরত হাজারো শিশু সপ্তাহে ৬৪ ঘণ্টা করে কাজ করে থাকে। যাদের অনেকে পোশাক শিল্পে কাজ করছে এবং বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর পোশাক তৈরিতেও অবদান রাখছে। লন্ডনভিত্তিক ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকার ২৭০০ বস্তিবাসীর ওপর এক জরিপের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটি বুধবার প্রকাশিত হয়।

তবে জরিপের এ তথ্যের সঙ্গে একমত নয় সরকার। বরং গত ১০ বছরে বাংলাদেশে শিশু শ্রম ৫০ শতাংশ কমে এসেছে বলে জানানো হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আগামী ২০২১ সালে শিশুশ্রম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার।

আর বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে শিশুশ্রম কমলেও তা এখনো উদ্বেগজনক হারে রয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধ করতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিকভাবে শিশুদের পুনর্বাসনও জরুরি।

দারিদ্রই কারণ

ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনের সহ-লেখক মারিয়া কাত্তারি বলেন, স্কুলে যেতে চাইলেও দারিদ্র্যের কারণে খানিকটা বাধ্য হয়েই শিশুদেরকে কাজে পাঠাচ্ছে বাবা মায়েরা। এর মাধ্যমে শিশুর ভবিষ্যৎ বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এটা জেনেও তাদের কাজে পাঠাচ্ছেন তারা।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রায় ৬ থেকে ১৪ শতাংশ শিশু পূর্ণকালীন কাজ করার জন্য স্কুলে যেতে পারে না। রাজধানীর বস্তিগুলোর মাত্র ১০ বছর বয়সের ৮ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত। আর মাত্র ১৪ বছর বয়সেই এসব বস্তির প্রায় অর্ধেক শিশু পূর্ণকালীন কাজে যোগ দেয়।

রাজধানীর ঢাকার সর্বত্রই এসব শিশু শ্রমিকদের দেখা মেলে। জুলাই ৭, ২০১৬।
রাজধানীর ঢাকার সর্বত্রই এসব শিশু শ্রমিকদের দেখা মেলে। জুলাই ৭, ২০১৬।
স্টার মেইল
তবে কেবল ঢাকার বস্তির মধ্যেই নয়, দারিদ্র্যের কারণে সারা বাংলাদেশের অনেক শিশু নিজ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করতে কাজে নামে। বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুরা ক্ষেত, খামার কিংবা গৃহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে ।

বুধবার এ জরিপ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে এএফপি জানায়, বাংলাদেশের শিশু আইনে ১৪ বছরের কমবয়সী শিশুদের বিপজ্জনক কাজ করা নিষিদ্ধ। এমনকি কাউকে সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বলাও অবৈধ। এরপরেও শিশুশ্রম রয়েছে। কিছু কিছু কারখানার শ্রমিকরা আইডি কার্ড ব্যবহার করে না, যাতে তাদের বয়স যাচাই করা যায়।

সস্তার জন্যই শিশুশ্রম

মূলতঃ অল্প টাকায় বেশি শ্রম পাওয়ার জন্য শিশুশ্রমিকদের কাজে লাগানো হয়ে থাকে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী ও শিশুশ্রম বিষয়ক পর্যবেক্ষক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা আলী বেনারকে বলেন, “বাস্তবতা হলো সস্তায় শ্রম পাওয়ার জন্য শিশুদের ব্যবহার করা হয়। অল্প বেতন যেমন দেওয়া যায়, তেমনি যেমন খুশি ব্যবহারও করা যায়। এ কারণে গৃহশ্রমিক থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন কলকারখানাতে ছোট ছোট শিশুদের ব্যবহার করা হয়। ওদেরকে দিয়ে বেশি কাজ করালেও ওভারটাইম দিতে হয় না।”

তাঁর এ কথার সত্যতা মেলে ঢাকার মিরপুরের একটি রেস্টুরেন্টের কর্মচারি আবু সোহেলের কথায়। ১৩ বছরের এই কিশোর বেনারকে জানায়, খানিকটা বাধ্য হয়েই এখানে কাজ করতে হয়। মাত্র তিন হাজার টাকায় প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়।”

সোহেলের পরিবর্তে প্রাপ্ত বয়স্ক কোনো কর্মচারি নিয়োগ করতে হলে তাকে অন্ততঃ ৭-৮ হাজার টাকা দিতে হতো বলে বেনারকে জানান রেস্টুরেন্টটির মালিক আবুল হোসেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের জায়গা চিহ্নিত করা থাকলেও সেসব জায়গায় এখনো অনেক শিশু কাজ করে।”

সালমা আলী বলেন, “শিশুশ্রম বন্ধে সুক্ষ্মভাবে মনিটরিং করার কোনো ম্যাকানিজম সরকারের নেই, রয়েছে কো-অর্ডিনেশনেরও অভাব। এ বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ আরো অনেকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি শিশুদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। তবেই দেশে শিশুশ্রম বন্ধ হবে।”

৫০ শতাংশ শিশুশ্রম কমেছে, দাবি সরকারের

এদিকে এ জরিপের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে পোশাক কারখানার প্রধান পরিদর্শক শিশুশ্রম বিষয়ক পর্যবেক্ষক কমিটির প্রধান সাঈদ আহমেদ বেনারকে বলেন, “একটা সাধারণ মানুষ যেখানে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করে, সেখানে একজন শিশু কীভাবে ৬৪ ঘণ্টা কাজ করবে? প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে ওভারটাইম ধরলেও এত ঘণ্টা কাজ করা সম্ভব নয়। এই জরিপ তারা কীভাবে করেছেন তা আমার বোধগম্য নয়।”

গত ১০ বছরে শিশু শ্রম অর্ধেকে নেমে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “২০০৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেশে ৩৪ লক্ষ শিশু শ্রমিক দেখা গিয়েছিল। ২০১৩ সালের জরিপে (২০১৫-তে প্রকাশিত) তা ১৭ লক্ষ-তে নেমেছে। অর্থাৎ ১০ বছরে শিশু শ্রমিক ৫০ শতাংশ কমে এসেছে। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।