গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসল সরকার

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.01.14
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসল সরকার হঠাৎ করে বড়াতে থাকা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করলেও তা মানছেন না অনেকে। ছবিটি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে তোলা। ১৪ জানুয়ারি ২০২২।
[ফোকাস বাংলা]

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নেয়াসহ সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশনা পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ মানছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতি খোলা রেখে এবং ব্যাপক আকারে বাণিজ্য মেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রেখে ১২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর সরকারের ১১-দফা নির্দেশনা পালন সম্ভব নয়। গত ১ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা শুরু হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হচ্ছে।

ফলে, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য। জনগণ যেমন মানছে না, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

পরিবহন মালিকদের হুমকির মুখে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস, টেম্পু, হিউম্যান হলার পরিচালনার সিদ্ধান্ত থেকে শুক্রবার সরে এসেছে সরকার।

একইভাবে পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমণ স্থগিত করলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা আবার চালু করা হয়েছে।

মালিকেরা কি লোকসান দিয়ে গাড়ি চালাবে?’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বেনারকে বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, বাসসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী চলাচল করবে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হবে না। তাহলে এটা কেমন সিদ্ধান্ত। বাস মালিকেরা কি লোকসান দিয়ে গাড়ি চালাবেন?”

তিনি বলেন, “এটি সম্ভব নয়। কেউ লোকসান দিয়ে পরিবহন পরিচালনা করবে না। সে কারণে, আমরা বলেছিলাম, হয় ভাড়া বৃদ্ধি করতে হবে, অন্যথায় আমরা গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেবো।”

শাজাহান খান বলেন, “প্রকৃতপক্ষে, ঢাকা শহরে কোনভাবেই অর্ধেক যাত্রী নিয়ে যানবাহন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। যেহেতু, অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোদমে চলছে, সকল অফিস-আদালত খোলা সেহেতু মানুষ পিক আওয়ারে একসাথে বের হবেন।”

তিনি বলেন, “আমাদের বাসগুলোতে বসে-দাঁড়িয়ে যাত্রীরা চলাচল করেন। একটি মিনিবাসে ৩০ থেকে ৪০ সিট থাকলেও এর চেয়ে বেশিসংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলাচল করা হয়। যখনই বলা হবে সিটের বাইরে যাত্রী নেয়া হবে না তখনই মানুষ বিশেষ করে পিক আওয়ারে হুড়োহুড়ি করে বাসে উঠে পড়বে। কাউকে ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে আমরা চেষ্টা করব যেন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন না হয়।”

সরকারদলীয় সাংসদ শাজাহান খান বলেন, “সরকারের যারা এই ধরনের নিয়ম তৈরি করেন তাঁদের এই সমাজ সম্পর্কে ধারণা নেই।”

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক সিতাংশু শেখর শুক্রবার বেনারকে বলেন, “বাসগুলোর অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচল করার কথা। এই সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে এসেছি, যদিও ব্যাপারে এখনও কোনো আদেশ জারি করা হয়নি।”

তিনি বলেন, “বিআরটিএ চেয়ারম্যান স্যার মৌখিকভাবে মালিক সমিতির নেতাদের অর্ধেক নয়, পুরো সিটের বিপরীতে যাত্রী পরিবহন করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন।”

“অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়,” জানিয়ে মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী চলাচলকারী শিকড় পরিবহনের সুপারভাইজার মো. আফজাল শুক্রবার বেনারকে বলেন, “অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গাড়ি চললে শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ গাড়ি পাবে না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সবই তো খোলা। সবকিছু খোলা রেখে এই নিয়ম মানা যায় না।”

অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গাড়ি চালানোর জন্য “সরকারের এই নির্দেশনা আসলেই অর্থহীন,” উল্লেখ করে মিরপুর সাড়ে এগারো এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বেনারকে বলেন, “শপিংমল খোলা, বাণিজ্য মেলা চলছে। সব স্বাভাবিক এই অবস্থায় এই নির্দেশনা কে মানবে?”

সরকারের একার দায়িত্ব নয়

জানুয়ারি মাসের শুরু থেকেই বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ শুরু হলে অতিসংক্রমণযোগ্য ওমিক্রন জাতীয় করোনাভাইরাসের বিস্তার মোকাবিলা করতে ১০ জানুয়ারি ১১ দফা নির্দেশনা জারি করে সরকার।

এই সকল নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে, বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে হবে, বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরায় টিকা সনদ ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না, টিকা না নেয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারবে না, রাজনৈতিক, সামাজিকসহ সকল জনসমাবেশে করা যাবে না, ইত্যাদি।

সরকার ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে লকডাউন না দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।

ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এর প্রেসিডেন্ট মো. জসিম উদ্দিন বেনারকে বলেন, “লকডাউন কোনো সমাধান নয়। লকডাউন দেয়া হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এতে সার্বিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

তবে “নির্দেশনা নিয়ে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো সঠিক নয়,” বলে মনে করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “সরকারের সিদ্ধান্ত লকডাউন দেয়া হবে না। অন্যদিকে সংক্রমণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং, সরকারের দায়িত্ব হলো কীভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায় সেব্যাপারে জনগণকে জানানো। সরকার সেটিই করেছে।”

“এখন এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনগণসহ সকলের। এটা সরকারের একার দায়িত্ব নয়,” বলেন মোশতাক।

তিনি বলেন, “রেস্টুরেন্টে টিকা না নেয়া মানুষদের যাওয়া নিরুৎসাহিত করতেই বলা হয়েছে টিকার সনদ দেখাতে হবে। কারণ টিকা না নেয়া মানুষ, টিকা নেয়া মানুষের চাইতে বেশি ঝুঁকিতে আছেন।”

এদিকে করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে সভা-সমাবেশে ওপর দেয়া সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

শুক্রবার দলের গুলশানস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘অগণতান্ত্রিক, দমনমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে বিরোধীদলের চলমান ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন ও বাধাগ্রস্ত করতে এই বিধিনিষেধ দিয়েছে সরকার’।

সরকারি বিধিনিষেধের সাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান সাংঘর্ষিক বলে সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

তবে বিএনপির এই অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান বেনারকে বলেন, “দেশে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সরকারি নির্দেশনা। বিএনপি মহাসচিব ও তাঁর স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।”

অসুস্থ দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ডিসেম্বর মাস থেকে সারাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করেছে বিএনপি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো বড়ো বাধা দেখা যায়নি।

সেই কর্মসূচির অংশ হিসাবে ৮ থেকে ২২ জানুয়ারি সারাদেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে বিএনপি, যদিও সরকারের বিধিনিষেধের আলোকে দলের কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করা হয়।

বর্তমানে সারাদেশে ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচন পরিচালনা করছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি পালনের কোনো লক্ষণই নেই। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে।

শনাক্তের হার প্রায় ১৫ শতাংশ

শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চার হাজার ৩৭৮ জন নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ছয় জন।

বৃহস্পতিবার তিন হাজার ৩৫৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। পরীক্ষা করা নমুনার বিপরীতে শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়। নতুন রোগীসহ সারাদেশে থেকে শুক্রবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৬ লাখ নয় হাজার ৪২ জন।

সেই বছর ১৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসে প্রথম রোগীর মৃত্যু হয়। শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ২৮ হাজার ১২৯ জন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন