করোনা সংক্রমণের মাঝেই শুরু হলো ট্রেন, ভারত থেকে আমদানিও শুরু

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-05-01
Share
200501-BD-toxic-ship-620.JPG করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় জনসমাগম এড়াতে সরকার নির্ধারিত সাধারণ ছুটির বিধিনিষেধ শিথিল করে গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেয়ায় একটি ফেরিতে করে মাওয়া ঘাটে এসে নামা ঢাকামুখী মানুষের ঢল। ৩০ এপ্রিল ২০২০।
[রয়টার্স]

দেশে করোনার রোগী ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেই শুক্রবার চালু হয়েছে পার্সেল ট্রেন, বৃহস্পতিবার খুলে দেয়া হয়েছে দেশের প্রধান স্থল বন্দর বেনাপোল। এর আগে খুলে দেয়া হয় পোশাক কারখানা, অনুমতি দেওয়া হয়েছে রেস্টুরেন্ট খোলা রাখার।

এর মধ্যে দোকানপাট খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুক্রবার দুটি পার্সেল ট্রেন চলাচলেরর মধ্যে দিয়ে দেশে রেল যোগাযোগ শুরু হয়েছে বলে বেনারকে জানান ঢাকা রেলওয়ে বিভাগের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শওকত জামিল মোহসীন। শুধু পণ্য পরিবহনের জন্য এই ট্রেন চলাচল শুরু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বন্ধ থাকার ৩৮ দিন পর বৃহস্পতিবার বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে জরুরি কিছু পণ্য আমদানি হয়েছে বলে বেনারকে জানান বেনাপোল বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবির তরফদার।

এর আগে ২৬ এপ্রিল দেশের তৈরি পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হয়, এরপর অনুমতি দেওয়া হয় রেস্টুরেন্ট খোলা রাখার।

ঈদকে সামনে রেখে এবার সব ধরনের দোকানপাট, বিপণিবিতান ও শপিং মল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সোমবার বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে লেখা এক চিঠিতে ১ মে থেকে দোকান খুলতে চাইলেও সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ক্রমান্বয়ে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার দিকে এগুচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর বিরোধিতা করে মে মাসের মাঝামাঝি সময়কে করোনা সংক্রমণের ‘পিক টাইম’ উল্লেখ করে চলমান ছুটি ও চলাচলে বিধিনিধেষ আরো বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া চলমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৫ মে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সাধারণ ছুটি ও চলাচলে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলে বাংলাদেশকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বেনারকে বলেন, মে মাসের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে করোনাভাইরারে ‘পিক টাইম’ দেখা দিতে পারে। তাই এখন সময় সবকিছুকে নিয়ন্ত্রেণে রাখার।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক আহমেদ বেনারকে বলেন, “বিধিনিষেধ শিথিল করার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম শর্ত হলো সংক্রমণ কমছে তার প্রমাণ থাকা। কিন্তু বাংলাদেশে সংক্রমণ বাড়ছে।”

“সুতরাং এই পরিস্থিতিতিতে সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রশ্নই আসে না। অন্যথায় ইতালি বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে,” বলেন তিনি।

মুশতাক আহমেদ বলেন, “দেশে করোনাভাইরাসের প্রবণতা উর্ধ্বমুখি হলেও এখনো নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা আমাদের আছে। শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বেনারকে বলেন, “সংক্রমণ ঠেকানোর একমাত্র এবং কার্যকর পন্থা হলো সারা দেশে কঠোর লকডাউন। যেভাবে কলকারখানা খুলে দেওয়া হচ্ছে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। এতে করে সাধারণ মানুষ বাইরে চলাচল শুরু করবে।”

তাঁর মতে, “কারখানা যদি খুলতেই হয় তাহলে কর্মীদের তালিকা করে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে করোনামুক্ত কর্মীদের বাসা থেকে কারখানায় যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।”

এদিকে এক দিনে আরও ৫৭১ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ার মধ্য দিয়ে শুক্রবার বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ২৩৮ জনে পৌঁছেছে। এছাড়া আরও ২ জনের মৃত্যু হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৭০ জন হয়েছে বলে শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে জানানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, শুক্রবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩ লাখ ২৯ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন দুই লাখ ৩৭ হাজারের বেশি।

শূন্য রেখায় আমদানি কার্যক্রম

বেনাপোল বন্দর খুললেও বৃহস্পতিবার শুধু কিছু জরুরি পণ্য আমদানি হয়েছে। কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি বলে জানান বন্দরের উপ-পরিচালক মামুন কবির।

তিনি বলেন, বিজিবি ও বিএসএফের নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় সীমান্তের শূন্য রেখায় স্বল্প পরিসরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য শুরু করা হয়। প্রথম দিনে ২৫ টন পাট বীজ ও ১০ টন ভুট্টা আমদানি করা হয়।”

“পাটের শেষ সিজন চলে যাচ্ছে, এই অবস্থায় জরুরি কৃষি পণ্য হিসেবে পাটবীজ আমদানি করা হলো। শুক্রবার বন্ধ থাকার পরে শনিবার থেকে পেঁয়াজ, আদা, ফলমূলসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্যের আমদানি হবে,” মামুন কবির বলেন।

বন্দরের তিনটা রুটই কাল থেকে সমানভাবে চলবে বলে জানান তিনি।

যতটুকু সম্ভব স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা মেনে পণ্য খালাস করা হচ্ছে উল্লেখ করে মামুন কবির বলেন, “চেকপোস্ট এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়। পরে ভারতীয় ট্রাক থেকে বাংলাদেশি ট্রাকে পণ্য খালাস করা হয়। শ্রমিকরাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করছেন।”

তিনি জানান, পণ্যের পাশাপাশি লক ডাউনের কারণে ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিরা বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছেন। কোনো ভারতীয়কে বাংলাদেশে আসতে দেওয়া হচ্ছে না।

পার্সেল ট্রেন চলাচল শুরু

ঢাকা রেলওয়ে বিভাগের কর্মকর্তা শওকত জামিল মোহসীন সাংবাদিকদের জানান, শুক্রবার সকাল দশটায় চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা পার্সেল ট্রেনটি সন্ধ্যা সাতটায় ঢাকা পৌঁছায়। এছাড়া শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় দেওয়ানগঞ্জ থেকে আরেকটি পার্সেল ট্রেন ঢাকার উদ্দেশে ছেড়েছে। ট্রেনটি মধ্যরাতে ঢাকায় পৌঁছুতে পারে।

আজ তিনটি পোর্সেল ট্রেন চালুর কথা ছিল। কিন্তু প্রথম দিনে মালামাল না থাকায় খুলনা থেকে ঢাকায় আসার জন্য নির্ধারিত পার্সেল ট্রেনটি বাতিল করা হয়।

 

 

দোকান চালু করতে চান ব্যবসায়ীরা

সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি আগামী ৫ মে পর্যন্ত হলেও আজ (১ মে) থেকে পাইকারি, ক্ষুদ্র, খুচরা মার্কেট ও দোকান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।

সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বেনারকে বলেন, “গত মার্চ মাস থেকে সারা দেশের দোকান-পাট বন্ধ থাকায় এসব ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এতদিন দোকানপাট বন্ধ থাকায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার পুঁজি নষ্ট হয়েছে।”

তিনি বলেন, “পবিত্র রমজান ও ঈদ উপলক্ষ্যে ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়, তাও নষ্ট হওয়ার পথে। এদিকে গত ২৬ এপ্রিল থেকে গার্মেন্টস খুলতে শুরু করায় শ্রমিকরাও দলে দলে আসতে শুরু করেছে।”

“তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা মে থেকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি চেয়েছি। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি সরকার,” বলেন হেলাল উদ্দিন।

ব্যবসায়ীরা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানান তিনি।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।