করোনাভাইরাস: হুমকির মুখে সাড়ে তিন লাখ দুগ্ধ খামারি

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-08-25
Share
200825_Corona-Dairy_farms_1000.jpg ঢাকার মিরপুর এলাকায় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্কভিটা) দুধ বিপণন ভ্যান। ১২ মে ২০২০।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে দেশের দুগ্ধ শিল্পে জড়িত সাড়ে তিন লাখের মতো খামারি, জীবিকার হুমকিতে প্রায় সোয়া কোটি মানুষ।

এই তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার দুগ্ধ খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

“প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র খামারিদের অবস্থা বেশি খারাপ,” বলেন তিনি।

এই খাতকে বাঁচাতে গত এপ্রিল সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও ধস ঠেকানো যায়নি।

কারণ “ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক দুগ্ধ খামারিরা এই প্রণোদনার সুফলটা সেভাবে পাচ্ছেন না,” বেনারকে জানান সরকারের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতিবিদ ডা. ভবতোষ কান্তি সরকার।

পুরো কৃষিখাতের জন্য ঘোষিত পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনার অর্থ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে পাঁচ শতাংশ সুদে ঋণ হিসাবে বিতরণ করা হচ্ছে।

“এ ক্ষেত্রে যেসব খামারির ব্যাংকগুলোর সাথে পুরানো লেনদেন রয়েছে, তারাই সুবিধা পাচ্ছেন,” বলেন ডা. ভবতোষ।

গত জুনের শুরুতেই প্রণোদনার ঋণ সুবিধার শর্ত শিথিল করার দাবিতে রংপুরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় ঘেরাও করেছিলেন দুগ্ধচাষিরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুগ্ধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রায়হান হাবিব বেনারকে বলেন, “প্রণোদনার অর্থ যাতে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক খামারিদের কাছে পৌঁছায় সে ব্যাপারে সরকারকেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।”

তবে প্রণোদনার অর্থ ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন ডা. ভবতোষ।

এ বিষয়টি মাথায় রেখে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন (এলডিডি) প্রকল্পের আওতায় খামারিদের সরাসরি আর্থিক সাহায্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক প্রথম আলোতে সম্প্রতি এই প্রকল্পের দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বিডিএফএ সভাপতি বলেন, “এলডিডিপির টাকা লুট হচ্ছে খবর পাচ্ছি। অথচ এই টাকা কিন্তু সরাসরি খামারিদের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল।”

“এলডিপির অর্থে আমাদের অন্তত যদি দুই-তিনটি গুঁড়োদুধের প্ল্যান্ট এবং কিছু ফ্রিজার ভ্যানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো, তাহলেও খামারিরা একটু বাঁচত,” বলেন তিনি।

“এলডিপিডি প্রকল্পের আওতায় কিছু জেলায় অন্তত সরকারি দুধ সংরক্ষণাগার করা দরকার। একইসঙ্গে খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে নেওয়ার কাজটি আরো উন্নত করা উচিত,” বলেন ড. রায়হান।

ড. ভবতোষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত দুগ্ধ খামারির সংখ্যা ৬১ হাজার ২৩৮ জন এবং চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী দেশে তিন লাখ ৫২ হাজার দুগ্ধবতী গাভী রয়েছে।

তবে বিডিএফএ সভাপতি বলেন, দেশে মোট খামারির সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে এক কোটি ২০ লাখ।

বিডিএফএ’র তথ্যমতে দেশে প্রতিদিন দুই কোটি ৪২ লক্ষ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে গত অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত হয়েছে ১০৬ দশমিক ৮০ লাখ মেট্রিক টন দুধ।

ছয় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

বিডিএফএ বলছে, গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নেওয়া লকডাউনের সময় দৈনিক গড়ে ৬০-৬৫ কোটি টাকার দুধ নষ্ট হয়েছে। ফলে মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ছয় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দুগ্ধ খামারিদের।

“শুধু রোজার ৩০টি দিন কোনো ক্ষতি হয়নি আমাদের। এখনও প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে,” বলেন ইমরান হোসেন।

ড. রায়হান জানান, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি, ৬০ শতাংশ দুধ চা বিক্রেতা এবং দধি-মিষ্টি প্রস্তুতকারকেরা কিনে নেন। এর বাইরে বাসাবাড়িতে বিক্রি হয় ৩০ শতাংশ এবং বাকি ১০ শতাংশ দুধ কেনে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো।

“জুলাইয়ের শুরু থেকে চা বা দধি-মিষ্টির দোকানগুলো খুললেও আমাদের কোনো লাভ হয়নি,” জানিয়ে ইমরান বলেন, “বিয়ে, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকীসহ বড় আয়োজনের সব সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় দধি-মিষ্টি তৈরির জন্য দুধের চাহিদা ৭৫ শতাংশ কমে গেছে।”

সর্বশান্ত অনেক খামারি

করোনা সংক্রমণের আগে পাইকারি হিসেবে প্রতি লিটার দুধ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হলেও এখন খুচরা বাজারে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে যেসব খামারি ব্যবসা গুটাতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগই সর্বশান্ত হয়েছেন জানিয়ে ইমরান বলেন, “যার দুই কোটির টাকা বিনিয়োগ ছিল, তিনি ৫০-৬০ লাখ টাকার বেশি ফেরত নিতে পারেননি।”

“তিন লাখ টাকার দুধের গরু দেড় লাখ টাকায়, অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও কম দামে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করতে হয়েছে,” বলেন তিনি।

“দুগ্ধ শিল্পের ওপর এটা একটা বড় ধরনের আঘাত,” মন্তব্য করে ডা. ভবতোষ বলেন, “তবে এখান থেকে উত্তরণের জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।”

বেড়েছে গো-খাদ্য ও ওষুধের সংকট

করোনা পরিস্থিতিতে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাবার কারণেও অনেক খামারি বিপাকে পড়েছেন বলে জানান সাদেক অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক মো. ইমরান।

তিনি বলেন, গো খাদ্যের অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে এক দিকে মালের সরবরাহ কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে পরিবহন খরচ।

“এছাড়া এবার বন্যায় কারণে প্রচুর ধানক্ষেত ডুবে যাওয়ায় খড়ের দাম বেড়েছে। যেখানে পাঁচ টাকা কেজি দরে খড় কিনতাম, সেখানে এখন ১৮-২০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে,” বলেন ইমরান হোসেন।

এছাড়া পশুচিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধ সাধারণত চীন থেকে আসে জানিয়ে তিনি বলেন, করোনা শুরুর পর সেগুলোরও সংকট দেখা দিয়েছে।

তবে মহামারির কারণে সরকারি খামারের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে বেনারকে জানান ঢাকার সাভারে অবস্থিত সরকারে কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আলী।

বর্তমানে তাঁদের ২৫১টি গাভী দৈনিক গড়ে এক হাজার ছয়শ লিটার দুধ দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এর মধ্যে এক হাজার দুইশ লিটার তাঁরা বিপণন করতে পারছেন, বাকিটা বাছুরদের খাওয়ানো হয়।

মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই লাখ ৯৯ হাজার ৬২৮ জন। আর মৃত্যু হয়েছে চার হাজার ২৮ জনের।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট দুই কোটি ৩৭ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন আট লাখ ১৪ হাজারের বেশি।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।