চট্টগ্রামে র‍্যাবের অভিযানে ৫ জঙ্গি গ্রেপ্তার, এদের একজন ৮ মাস আগেই আটক!

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.12.08
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে দুই দফায় জঙ্গি সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করে র‍্যাব। চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে দুই দফায় জঙ্গি সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করে র‍্যাব। ডিসেম্বর ০৮, ২০১৬।
স্টার মেইল

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে দুই দফায় জঙ্গি সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করেছে র‍্যাব। এ সময় বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়। র‍্যাব বলছে, ওই বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজিবি) সদস্য।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমে চট্টগ্রাম নগরের এ কে খান মোড় থেকে দুটি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয় দুই যুবককে। এরপর নগরের উত্তর কাট্টলী এলাকার একটি বাড়িতে পাঁচ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে র‍্যাবের সদস্যরা আরও তিন তরুণকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে নুরে আলম নামে একজনকে আটমাস আগে আটক করা হয়েছিল বলে পরিবার দাবি তোলার পর গ্রেপ্তার অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন; ফরিদপুরের মাওলানা মো. তাজুল ইসলাম (২৭), যশোরের মো. নাজিম উদ্দিন (৩৮), ঝিনাইদহের আবুজার গিফারী (২২), নীলফামারীর নুরে আলম ইসলাম (২২) ও রংপুরের শেখ ইফতিশাম আহমেদ (২৩)। তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে ১২টি গ্রেনেড, ম্যাগাজিন, গুলি, চাপাতি, ছুরি, সালফারসহ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

অভিযান শেষে র‍্যাবের পরিচালক (গণমাধ্যম) কমান্ডার মুফতি মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, পাঁচজনই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি-বি) সঙ্গে জড়িত।

তাঁর দাবি, আদালত থেকে কারাগারে আনা-নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে হুজি নেতাদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়ে তারা অস্ত্র লুটের পরিকল্পনা করেছিল।

অভিযানের বিষয়ে র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, গতকাল ভোরে এ কে খান মোড় থেকে তাজুল ও নাজিমকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের তিন সহযোগী ওই বাড়ির দোতলায় রয়েছেন বলে তথ্য দেয় তারা।

র‍্যাবের অধিনায়ক জানান, র‍্যাব সদস্যরা বাড়ির দোতলায় থাকা লোকজনকে বের হওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও কেউ বের হয়নি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে র‍্যাব সদস্যরা দরজা ভেঙে দোতলায় প্রবেশ করে। ঘরের ভেতর থেকে আবুজার, নুরে আলম ও ইফতিশাম নামে তিন জঙ্গিকে আটক করা হয়।

আট মাস আগে আটক নূরে আলম!

চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনের মধ্যে নূরে আলম নীলফামারী শহরের উকিলের মোড় এলাকার বাসিন্দা। গতকাল দুপুরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে গ্রেপ্তার হওয়া যুবকদের ছবি প্রচার করা হয়। এরপর নুরে আলমের মা নুর নাহার বেগম নীলফামারীর স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

নুর নাহার বেগম বলেন, “আমার ছেলে নুরে আলম নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। ওর বাবা আবদুল কাদের মারা গেছেন। বাসার সামনে আমাদের একটা মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকান আছে। সেটা সে চালাত।”

“গত ১১ এপ্রিল দিবাগত রাত দেড়টা থেকে দুইটার দিকে আমার ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে আসা কিছু লোক। তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে ধমক দিয়ে বলা হয়, আমরা প্রশাসনের লোক। ওকে নিয়ে যাচ্ছি, ২০ মিনিট পর রেখে যাব।” জানান নূর নাহার।

এ বিষয়ে নীলফামারী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবুল আকতার বেনারকে বলেন, চট্টগ্রামে র‍্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া নুরে আলম ও নিখোঁজ হওয়া নুরে আলম যে একই ব্যক্তি তা তাঁর পরিবার নিশ্চিত করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এর আগে থানায় জিডি করা হয়েছিল।

তবে র‍্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “নূরে আলম মুফতি মাইনুল ইসলাম কর্তৃক পরিচালিত ‘৩১৩ বদরের সৈনিক’ নামক জঙ্গি গ্রুপের একজন সক্রিয় সদস্য ছিল। মুফতি মাইনুল ইসলাম সদলবলে র‍্যাব কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থেকে পুনরায় জঙ্গি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ শুরু করে।”

র‍্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার মুফতি মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, কিছুদিন আগে হুজি-বির নেতা মাইনুল ইসলামকে আটক করা হয়। তখন ঢাকায় তাঁদের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে তাজুল ইসলামের নাম আসে। তাজুল এখন চট্টগ্রামে হুজিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন।

র‍্যাব কমান্ডার আরও বলেন, কারাগারে থাকা হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও আবদুর রউফের সঙ্গে গ্রেপ্তার নাজিম উদ্দিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। আবুজার কুষ্টিয়ার সমন্বয়ক। নুরে আলম ও ইফতিশামের বিষয়েও র‍্যাবের কাছে তথ্য রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে হুজির সঙ্গে যুক্ত।

নুরে আলমের মায়ের অভিযোগ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহফুজুল হক মারজান বেনারকে বলেন, এই আসামীকে যদি আগে থেকে ধরে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এমন কাজ জঙ্গিবাদকে দমন করবে না বরং আরো উস্কে দিবে।

মাহফুজুল হক বলেন, গুলশান হামলা পর থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো জঙ্গি দমনে কাজ করছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন কিছু প্রশ্ন উঠছে, যা অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আসলে আগে থেকে ধরে রাখা হয় কিনা বা কেন ধরে রাখা হয়—এসব প্রশ্নের জবাব থাকা প্রয়োজন।

তবে জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয় বলে মনে করেন ওই শিক্ষক। তাঁর মতে, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।