ঘূর্ণিঝড় ইয়াস: বাংলাদেশে তিন ও পশ্চিমবঙ্গে একজনের মৃত্যু

যাজ্ঞসেনী চক্রবর্তী ও কামরান রেজা চৌধুরী
2021.05.26
কলকাতা ও ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ঘূর্ণিঝড় ইয়াস: বাংলাদেশে তিন ও পশ্চিমবঙ্গে একজনের মৃত্যু সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এর প্রভাবে ভেঙে যাওয়া একটি রাস্তা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মেরামত করছেন এলাকাবাসী। মে ২৬ ২০২১।
[ফোকাস বাংলা]

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে বাংলাদেশে তিন এবং পশ্চিমবঙ্গে একজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যদিও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।

বুধবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশার উপকূলবর্তী এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে অবশেষে আরেক পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ড অভিমুখে ঘুরে গেছে ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’।  

বুধবার সন্ধ্যায় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দুপুর আড়াইটার পর থেকে অতি শক্তিশালী থেকে কমে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় ইয়াস। 

বাংলাদেশে আঘাত না করলেও ইয়াস এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঝড়ো হাওয়া ও জোয়ারের কারণে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতিসহ কমপক্ষে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। 

ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর (পূর্ব), উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায়। গঙ্গার জল প্রবেশ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাওড়া এবং হুগলি জেলার কিছু এলাকাও।

বুধবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রচারিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়জনিত প্রবল জলোচ্ছ্বাসের কারণে মোট ১৩৪টি বাঁধ ভেঙে নোনা জল প্রবেশ করেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেশ কিছু এলাকায়। 

“১৫ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে,” বলেন মুখ্যমন্ত্রী। 

বুধবার সকাল থেকেই পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা, শঙ্করপুর ও মন্দারমণিতে বিপুল জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়, সঙ্গে ১০০ থেকে ১২০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে হাওয়া ও প্রবল বৃষ্টি। 

কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলেও মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি চলে সারাদিন। জলমগ্ন হয়ে পড়ে দিঘা ও মন্দারমণি।

প্রত্যক্ষদর্শী ফটোগ্রাফার নির্মল মাইতি বেনারকে জানান, “দিঘা বাজার ৫ থেকে ৬ ফুট জলের তলায় চলে যায়।” 

ঘূর্ণিঝড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে মমতা জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করবেন তিনি। 

রাজ্য সরকারের হিসেবে, এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত এক কোটি মানুষ, ক্ষতি হয়েছে অন্তত তিন লাখ বাড়ি, যদিও ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। 

এর মধ্যে বুধবার দুপুর পর্যন্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে রাজ্য সচিবালয় নবান্ন থেকে সম্প্রচারিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক আধিকারিকরা। 

Kultali.jpg
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলের কুলতলি ব্লকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় প্লাবিত গ্রাম থেকে নৌকায় করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাচ্ছেন কয়েকজন গ্রামবাসী। ২৬ মে ২০২১। [বেনারনিউজ]

বাংলাদেশে তিনজন নিহত

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় তিন জেলায় এক শিশুসহ অন্তত তিনজন মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এর মধ্যে ভোলার লালমোহন উপজেলায় ঝড়ে গাছ ভেঙে একজন, ফেনী সোনাগাজী উপজেলায় বাতাসে নৌকা উল্টে এক জেলে ও বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে পানিতে ডুবে চার বছরের এক শিশু মারা গেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন জেলার জেলা প্রশাসকেরা।

এছাড়া সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী ও বরগুনার জেলা প্রশাসকেরা বুধবার বেনারকে জানান, ইয়াসের প্রভাবে জেলাগুলোর বেশ কিছু এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামাঞ্চল প্লাবিত হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

তবে এখনো ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। 

ভেঙে গেছে সেন্টমার্টিনের একমাত্র জেটি

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এবং জোয়ারের ঢেউয়ের তোড়ে ভেঙে গেছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টিনের হাজারো পর্যটকসহ স্থানীয়দের চলাচলের একমাত্র জেটিটি।

“সংস্কারের অভাবে এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে জেটিটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে সাগর থেকে প্রচণ্ড ঢেউ আছড়ে পড়েছে জেটির ওপর। যে কারণে জেটিটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে,” বেনারকে বলেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হাবিব খান।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দ্বীপের অন্তত সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “হুমকির মুখে পড়েছে পুলিশের গেস্ট হাউসসহ প্রিন্স হেভেন ও প্রাসাদ প্যারাডাইস নামের দুটি আবাসিক হোটেল।”

দ্বীপের চারপাশে ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই এই দ্বীপ সাগরে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে বেনারের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর আহমদ।

এর বাইরে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, টেকনাফসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ায় অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ। 

প্রাথমিকভাবে জেলায় দুই হাজার ৫৭০টি কাঁচাবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

জেলায় প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে বলে বেনারকে জানান কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী।

অক্ষত ভাসানচর

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বেনারকে বলেন, জেলার হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যেখানে বাঁধ ছিল না সেখানে জোয়ারের পানি ঢুকে গেছে। হাতিয়ায় ১২ বছরের একটি শিশু নিখোঁজ রয়েছে।

ভাসানচরে কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান খোরশেদ আলম খান।

ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক ও নৌবাহিনীর কমোডর রাশেদ সাত্তার বেনারকে বলেন, ভাসানচরে সাড়ে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বসবাস করছে। 

“ইয়াসের কারণে ভাসানচরে কোনো পানি প্রবেশ করেনি অথবা বাঁধের কোনো প্রকার ক্ষতি হয়নি,” জানিয়ে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা বুঝতেই পারেনি যে ইয়াস এসে শেষ হয়ে গেছে।” 

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার আপত্তির মুখে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে গত ডিসেম্বরের পর সরকার কয়েক দফায় ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে বঙ্গপোসাগরের দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তর করে। জাতিসংঘের মতে, দ্বীপটি ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ।

কক্সবাজার থেকে প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সুনীল বড়ুয়া।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।