র‍্যাবের হুঁশিয়ারির পরদিন বন্দুকযুদ্ধে দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-05-15
Share
ঢাকার ওসমানী উদ্যানে মাদক সেবনের দৃশ্য। ঢাকার ওসমানী উদ্যানে মাদক সেবনের দৃশ্য। ৩০ মার্চ ২০১৫।
বেনারনিউজ

র‍্যাবের তরফ থেকে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি করার ঘোষণা দেওয়ার একদিনের মাথায় র‍্যাবের সঙ্গে পৃথক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন নিহত হয়েছেন। র‍্যাব বলছে নিহত দুজনই ‘কুখ্যাত মাদকব্যাবসায়ী’। ঘটনা দুটির একটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ও অন্যটি কুষ্টিয়ায়।

নারায়ণগঞ্জে নিহত ব্যক্তির নাম রাজ মহল রিপন (৩০)। র‍্যাব জানায়, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তারা সানারপাড়ে চেক পোস্ট বসিয়েছিল। গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় র‍্যাব একটি ট্রাককে থামতে বলে। সেটি না থেমে র‍্যাবের দিকে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে র‍্যাব পাল্টা গুলি ছুড়লে ট্রাকচালক গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় দুজন পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় ট্রাকচালককে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

র‍্যাবের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আলেপ উদ্দিন বলেন, ট্রাকে মালামাল পরিবহনের আড়ালে আসলে সে মাদক বিক্রি করত।

“আমরা জানতে পেরেছি নিহত রিপন টেকনাফ থেকে ইয়াবা বড়ির বড় বড় চালান ট্রাকে করে এনে নারায়ণগঞ্জে বিক্রি করতেন। তাঁর জিম্মা থেকে র‍্যাব ১০ হাজার ইয়াবা, দুটি পিস্তল ও দুই লাখ টাকা উদ্ধার করেছে,” আলেপ উদ্দিন নারায়ণগঞ্জে সাংবাদিকদের বলেন।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত ট্রাকচালকের মৃতদেহটি মর্গে ছিল। পরিবারের কেউ তাঁর খোঁজে আসেননি। ফলে নিহতের পরিবারের বক্তব্য পাওয়াও সম্ভব হয়নি।

কুষ্টিয়ায় র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন হামিদুল ইসলাম (৫০) নামের এক ব্যক্তি। র‍্যাব বলছে, গতকাল ভোর ৫টার দিকে বালুর মাঠ এলাকায় হামিদুলের অবস্থানের খবর পেয়ে র‍্যাব সেখানে যায়। হামিদুল বাহিনী র‍্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে র‍্যাবের দুজন সদস্য আহত হয়। পরে র‍্যাবও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে হামিদুল আহত হলে তাঁকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

‘“হামিদুল কুখ্যাত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে মাদক মামলাসহ এখন পর্যন্ত ১৭/১৮টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। অসংখ্য জিডিও আছে। আমরা এগুলোর খোঁজ নিচ্ছি,” বেনারকে বলেন র‍্যাব-১২ কুষ্টিয়া ক্যাম্পের অধিনায়ক এম মুহাইমনির রশিদ।

র‍্যাবের হুঁশিয়ারি

র‍্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গত সোমবার কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, চলমান অভিযানে র‍্যাব নিয়মিত মামলা করার চাইতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে। নিয়মিত মামলা রুজুর পর সেটি যখন বিচারের জন্য আদালতে উঠবে তখন বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।

র‍্যাবের মহাপরিচালক বলেন, মাদক ও জঙ্গি অপরাধ অন্য কোনো অপরাধের মতো নয়। কৌঁসুলি, আইনজীবী প্রত্যেকের উচিত আইনের ফাঁক গলে যেন একজন মাদক বিক্রেতাও বেরিয়ে যেতে না পারে সে জন্য সচেষ্ট থাকা।

উল্লেখ্য, গত ৩ মে র‍্যাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মাদক নির্মূলে র‍্যাবের কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। র‍্যাব ডিজি বলেছেন, মাদকের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা স্পষ্ট। সবাই যেন সতর্ক হয়ে যান।

“আমি বলব যাঁরা মাদক সেবন করছেন, তাঁরা বন্ধ করুন। যাঁরা মাদক বিক্রি, মজুত ও পাচারের সঙ্গে জড়িত তাঁরাও বন্ধ করুন। যাঁরা মজুত করেছেন তাঁদের বলব র‍্যাব অফিসের আশপাশে ফেলে রেখে যান,” বেনজীর আহমেদ বলেন।

নইলে কঠোরতম ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মহাপরিচালক সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, প্রাত্যহিক দায়িত্ব পালনের পর গাড়িগুলো কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে সেদিকে নজর রাখা দরকার।

মাদক পাচার ও কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সুসম্পর্কের অভিযোগ পুরোনো। এ নিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে র‍্যাব আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না।

র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, “র‍্যাবের অভিযান কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়, এ অভিযান সামগ্রিক। আমি জনপ্রতিনিধিদের বলব মাদকের সঙ্গে জড়িতদের আশ্রয় দেবেন না।”

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা জারির পর গত ৪ মে থেকে ১৪ মে পর্যন্ত র‍্যাব ৩৮১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

‘বন্দুকযুদ্ধ’ই সমাধান?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মুখপাত্র খোরশিদ আলম চঞ্চল বলছিলেন, মাদক নির্মূলে উপর্যুপরি অভিযানের পরও আসলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা ইয়াবা। দেশের প্রায় ৭০ লাখ মাদকসেবী আছেন। গত এক বছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ১২ হাজার মাদকবিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করেছে, মামলা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর গলে তাঁরা বেরিয়ে আসছেন।

“মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পে পঁচিশ নামে একজন মাদক বিক্রেতা আছে। তাকে বহু কষ্টে গ্রেপ্তার করা হয়। সপ্তাহখানেক মতো জেলে ছিল। তারপর বেরিয়ে আসে। একটি পত্রিকা ব্যঙ্গ করে তখন লিখেছিল, পঁচিশকে গ্রেপ্তার করে পঁচিশ দিনও জেলে রাখতে পারল না অধিদপ্তর,” বেনারকে বলছিলেন খোরশিদ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাঁদের কোনো চেষ্টাই সফল হচ্ছে না। মাদকের কারণে পারিবারিক নির্যাতন, ছিনতাই বাড়ছে। এমনকি গতকালও শাহবাগের ফুটওভার ব্রিজের ওপর এক মাদক ব্যবসায়ীর ছুরিকাঘাতে নুরুন্নবী নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। নেশাগ্রস্ত হত্যাকারী পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাকে ধরে ফেলে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলছিলেন, সুনির্দিষ্টভাবে এ দুটি বন্দুকযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। তবে অপরাধ যত বড়ই হোক আইনের ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো সুযোগ নেই।

“বন্দুকযুদ্ধ সমাধান নয়। আমি বিশ্বাস করি সবক্ষেত্রে আইনের মধ্যে থেকে অন্যায় রোধ করা উচিত,” নজরুল ইসলাম বেনারনিউজকে বলেন।

উল্লেখ্য, গত সোমবারও জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ এর আলোচনায় এক ডজনেরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি তোলেন।

সভায় বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকলে সরকারের নীতি জিরো টলারেন্স। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ কথা বলেন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন