মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা পাচ্ছেন অর্থ পাচার তদন্তের ক্ষমতা

কামরান রেজা চৌধুরী
2018.06.20
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন। চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন। ২০ জুন ২০১৮।
বেনারনিউজ

অবৈধ মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করার ক্ষমতা পাচ্ছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রস্তাবিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ সংসদে পাশ হলে তাঁরা এই ক্ষমতা পাবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা বলেন, “সংশোধিত আইনে মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারসহ মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হবে।”

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া আসনের সাংসদ মো. রুস্তম আলী ফরাজির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতাকারী ও মাদকের গডফাদারসহ মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ প্রণয়ন করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “এই আইনে মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও আইনের আওতায় আনার জন্য মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং এগুলো পরিবহনের বাহন উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য সংশ্লিষ্ট ১৫ হাজার ৩৩৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মোট ২০ হাজার ৭৬৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে চলমান অভিযানে কতজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে সেই তথ্য তিনি জানাননি।

২০১৭ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সব সংস্থা এক লাখ ৩২ হাজার ৮৮৩ জন মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এক লাখ ৬ হাজার ৫৩৬টি মামলা দায়ের করেছে বলেও জানান তিনি।

বর্তমানে “মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মাদক অপরাধীদের তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া হচ্ছে” জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদক অপরাধ সংক্রান্ত মামলার বিচার কার্যক্রম আলাদা কোনো আদালতের মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়টি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, মাদক সমস্যা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ে নিয়মিত ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়াবা পাচার রোধে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি বৈঠকেই মিয়ানমারকে ইয়াবার উৎপাদন ও প্রবাহ বন্ধ করার জন্য এবং মিয়ানমার সীমান্তে ইয়াবা তৈরির কারখানা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।

কেন এই ক্ষমতা?

মাদকের মামলা তদন্ত করতে গিয়ে অর্থ পাচারের বিষয় পেলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বাংলাদেশ ব্যাংককে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার সুপারিশ করে বলে বেনারকে জানান অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, “আমরা যদি অর্থ পাচারের বিষয় নিয়ে তদন্ত করতে চাই সে ক্ষেত্রে কোর্টের অনুমতি প্রয়োজন হয়। অর্থ পাচার সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হলে আমাদের আর আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হবে না।”

সৈয়দ তৌফিক জানান, জাহিদুল ইসলাম আলো নামক চট্টগ্রামের একজন মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাদকের মামলা তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো হয়েছে। কেন পাঠানো হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অর্থাৎ সেই টাকা পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

তিনি বলেন, আলো ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে। তবে, অর্থ পাচার মামলায় মাহমুদুল হাসান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সরাসরি মানি লন্ডারিং মামলাগুলো তদন্ত করতে দেওয়ার চিন্তা হলেও আমি মনে করি, বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে অপরাধগুলো মোটামুটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি হলো মূল বাধা। তাই মাদক কর্মকর্তাদের মানি লন্ডারিং মামলা তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ায় অবস্থার খুব বেশি যে পরিবর্তন হবে তা মনে হয় না।”

মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার অর্ধ শতাধিক

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বুধবার মাদক বিরোধী অভিযান হয়েছে। তবে এইদিন কেউ নিহত হয়নি।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় মঙ্গলবার রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘গুলি বিনিময়ে’ ফালু (৪০) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন বলে জানায় মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ।

এদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বুধবার অভিযান চালিয়ে ৭০০ ইয়াবা বড়িসহ ৫১ জনকে আটক করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান মহানগর পুলিশের এডিসি ওয়াহিদুল ইসলাম।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানাধীন শহীদ লেন এলাকার মাদকের আখড়ায় অভিযান চালিয়ে অর্ধ শতাধিক ঘর ও স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে পুলিশ। অভিযানের সময় একটি ঘর থেকে ১০০টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার হয়।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরের দড়ি সোনাকান্দা এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীর ছুরিকাঘাতে বন্দর থানা-পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক ইলিয়াছ খান আহত হয়েছেন।

ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মাদক ব্যবসায়ী টুকু (৫৫) এবং তার ছেলে রবিউলকে (২৮) গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম শাহীন মন্ডল।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় পৃথক অভিযানে ইয়াবা ও বিদেশি মদসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করছে র‌্যাব। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের শিকারপুর এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় মডেল থানার ওসি আকরাম হোসেনের পর এবার মাদক পাচারে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হিজলগাড়ি পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এএসআই) তুহিন আখতারকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তাঁকে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।