চট্টগ্রামে মাদক ও কোটি টাকাসহ রোহিঙ্গা দম্পতি গ্রেপ্তার

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-11-09
Share
201109_Rohingya_couple_arrested_620.jpg চট্টগ্রামে র‍্যাবের অভিযানে মাদকসহ গ্রেপ্তার হওয়া রোহিঙ্গা শওকত ইসলাম। ৮ নভেম্বর ২০২০।
[ছবি: র‍্যাবের সৌজন্যে]

চট্টগ্রামে নগদ এক কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং সোয়া পাঁচ হাজার ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গা দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রোববার নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার এক বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে বেনারকে জানান র‌্যাব-৭ চান্দগাঁও ক্যাম্পের অধিনায়ক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আলী আশরাফ তুষার।

“আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা জানালা দিয়ে নিচে টাকা ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। বাড়ি ঘিরে রাখা সদস্যরা জানালা দিয়ে টাকা পড়তে দেখে ঘরে ঢুকে আরো কিছু টাকা উদ্ধার করে,” বলেন আলী আশরাফ।

তিনি জানান, “সব মিলিয়ে ওই বাসা থেকে এক কোটি ১৭ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। টাকা নিচে ফেলে দেওয়ার পাশাপাশি তারা ইয়াবাগুলো নিজেদের শরীরে লুকিয়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরে তল্লাশি করে ৫ হাজার ৩০০টি ইয়াবা পাওয়া যায়।”

আলী আশরাফ জানান, এসব টাকা ইয়াবা বিক্রি থেকে পাওয়া বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায় তারা। জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট না থাকায় তারা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে পারেনি। এ জন্য সব টাকা তারা বাড়িতেই রাখত। ওদের কাছে তিনটি ভুয়া এনআইডি কার্ড পাওয়া গেছে।

র‍্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া শওকত ইসলাম (৩২) ও মোরজিনা বেগম (২৮) মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা। ২০০৮ সালে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে আসেন।

র‌্যাব কর্মকর্তা আশরাফ বেনারকে বলেন, কক্সবাজারে তাদের একটি বড়ো সিন্ডিকেট আছে যারা মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসে। সেখান থেকে ইয়াবা চট্টগ্রামে সরবরাহ করে। চট্টগ্রামের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা এই দম্পতির কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করত।

গ্রেপ্তার রোহিঙ্গা দম্পতির বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় মাদক এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনে মামলা হয়েছে।

অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে জানিয়ে টেকনাফ নিবন্ধিত নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা মোহাম্মদ কামাল বেনারকে বলেন, “চট্রগ্রামে রোহিঙ্গা শরণার্থী দম্পতি মাদক ও কোটি টাকাসহ ধরা পড়ার বিষয়টি আমাদের বিব্রত করেছে। যদিও কিছু কিছু শরাণার্থী এখন সরাসরি মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।”

“মূলতঃ দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে শরণার্থীদের একটি অংশকে ইয়াবা পাচারের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী দল ও স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা। আর যেসব রোহিঙ্গা এইসব অপরাধ করছে তারা ক্যাম্পে থাকে না। তবে অপরাধ করার পর অনেকে ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়,” বলেন তিনি।

তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এপিবিএন অধিনায়ক পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়লেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শরণার্থী ক্যাম্পে তিন বছরে ৬৫ জন খুন হয়েছেন। এসব ঘটনায় এক হাজার সাতশ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে সাতশ জনকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া এই তিন বছরের বিভিন্ন সময়ে মাদক বিক্রির টাকা ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে ছয়শ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে শতাধিক রোহিঙ্গা নারী রয়েছেন। ক্যাম্পে নারীদের অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে খুব শিগগির ৪০ জন নারী সদস্য এপিবিএনে যুক্ত হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

বিজিবিতে হেলিকপ্টার সংযোজন

সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জন্য প্রথমবারের মতো দুটি অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হেলিকপ্টার দুটি উদ্বোধন শেষে তিনি বিজিবি’কে ‘ত্রিমাত্রিক বাহিনী’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

রাশিয়ার তৈরি এই দুটি হেলিকপ্টার বিজিবি’র কার্যক্রমে আরও গতি আনবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

“আমাদের সীমান্ত এলাকার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় মিয়ানমার এবং ভারতের কিছু অংশে ফিজিক্যাল টহল দেয়া প্রায় অসম্ভব,” বলে বেনারকে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার।

তিনি বলেন, “এলাকাগুলো দুর্গম ও পাহাড়ি। সে কারণে এই এলাকাগুলোতে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে। এখানে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করে। মানব পাচারের জন্যও এলাকাগুলো ব্যবহৃত হয়।”

“এই দুটি হেলিকপ্টারে অত্যাধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা রয়েছে। হেলিকপ্টার দুটি দিয়ে সীমান্তের ওই সকল এলাকায় দুই হাজার মিটার ওপর থেকে গভীর জঙ্গলে নজরদারি করা যাবে,” বলেন জেনারেল মোহাম্মদ আলী।

মিয়ানমার সেনাদের গুলিতে জেলে নিহত

কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) গুলিতে আহত এক ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

রবিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেলে মোহাম্মদ ইসলাম (৩৫) মারা যান। তিনি টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডের বরইতলী এলাকার গুরা মিয়ার ছেলে।

রোববার রাত সাড়ে বিষয়টি বেনারকে নিশ্চিত করে টেকনাফের বিজিবি ব্যাটালিয়ন-২ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ ফয়সাল হাসান খান বলেন, “এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে মিয়ানমার বিজিপির কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়েছে। তাতে ভবিষ্যতে নিজেদের প্রটোকল অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করার অনুরোধ জানানো হয়।”

টেকনাফ সদর ইউপি সদস্য নজির আহমদ বেনারকে বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় তিন জেলে কাঠের নৌকা নিয়ে মাছ শিকার করতে নাফ নদীতে নামেন। কিছুক্ষণ পর মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বিজিপি তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। অন্য জেলেরা রক্তাক্ত অবস্থায় মোাহম্মাদ হোসেনকে উদ্ধার করে টেকনাফ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইয়াবা চোরাচালান বন্ধে প্রায় দুই বছর ধরে নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ। কিন্তু অনেক জেলেই জীবিকার তাগিদে সেখানে মাছ শিকার করেন। আবার ইয়াবা চোরাকারবারিরাও জেলে সেজে নাফ নদীতে মাছ শিকারে যায়।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী ও টেকনাফ (কক্সবাজার) থেকে আবদুর রহমান।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।