ট্যানারি মালিকদের জরিমানা পরিশোধের সময় বেঁধে দিলো আদালত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2017-03-02
Share
রাজধানীর হাজারীবাগে ট্যানারির বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হয় পরিবেশ। রাজধানীর হাজারীবাগে ট্যানারির বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হয় পরিবেশ। ডিসেম্বর ৯, ২০১৬।
স্টার মেইল

হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিল, হাজারীবাগ এলাকা থেকে ট্যানারি না সরালে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ টাকার অংক কমিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু জরিমানার সেই টাকা পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকেরা।

বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে নেওয়ার পর হিসাব কষে দেখা গেছে, প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা হিসেবে এ পর্যন্ত মোট জরিমানা হয়েছে ৩০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। হাজারীবাগের ১৫৪টি ট্যানারি কারখানাকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারি কোষাগারে এই বিপুল টাকা জমা দিতে বলেছে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত।

বর্জ্যের বিষাক্ত প্রভাব থেকে ঢাকার ‘প্রাণ’ বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে ট্যানারি শিল্পকে সাভারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও ট্যানারি কারখানাগুলোকে নতুন শিল্প অঞ্চলে নেওয়া যাচ্ছে না।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের এক সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার জরিমানা আদায়ের এই কঠোর আদেশ দেন বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাই কোর্ট বেঞ্চ।

নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে টাকা জমা দিতে ব্যর্থ হলে ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বেনারকে বলেন, “আদালত ট্যানারি মালিকদের বকেয়া টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তা জমা না দিলে সিরিয়াস কনসিকোয়েন্স ফেস করতে হবে। আমরাও কারখানা বন্ধ বা মালিকদের গ্রেপ্তার করার আবেদন জানাবো।”

আদালতের এ রায় নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে চাননি ট্যানারি মালিকেরা। তবে দীর্ঘদিন ধরে আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর এ পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বেনারকে বলেন, “দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের দূষণ বন্ধ করা উচিত। কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যদি আইন না মানে, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

তিনি বলেন, “সরকারের সিদ্ধান্ত আছে ট্যানারি কারখানাগুলো সাভারে স্থানান্তর করতে হবে এবং সেখানেও ইটিপির মাধ্যমে বর্জ্যগুলো দূষণমুক্ত করতে হবে। এটা একটা আইনি প্রক্রিয়া। আর আইন বাস্তবায়নের জন্য সরকারকেই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।”

জানতে চাইলে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়ার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “আদালতের রায় এখনো আমরা হাতে পাইনি। তাই এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চাইছি না।”

এর আগে সাভারে কারখানা স্থানান্তর না করায় গত বছরের ১৬ জুন ট্যানারি মালিকদের পরিবেশের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।

পরে ওই রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে দিন প্রতি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে এবং ওই অর্থ আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব পড়ে শিল্প সচিবের ওপর।

এরপর আদালতের ওই নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিকভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় হয়নি মর্মে শিল্প সচিবের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। গত ২৫ জানুয়ারি শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে আদালতে তলব করা হয়।

১৩ ফেব্রুয়ারি সচিব আদালতে হাজির হয়ে জানান, হাজারীবাগে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক ট্যানারি কারখানা রয়েছে। ওইসব কারখানার বকেয়ার পরিমাণ ৩০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

শিল্প সচিব আদালতকে আরও জানান, আপিল বিভাগের ওই আদেশের পর গত আগস্ট মাসে ১৫০টি কোম্পানি ১০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়। তবে মাত্র চারটি কারখানা সেপ্টেম্বর মাসে এবং তিনটি কারখানা অক্টোবরে মাসে টাকা দিয়েছে।

মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের জানান, শিল্প সচিবের প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ট্যানারি কারখানাগুলোর কাছে সরকারের পাওনা হয়েছে ৩০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

তিনি বলেন, “আমরা আদালতের কাছে এসব ট্যানারি কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া অথবা তাদের ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির অথবা বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধ করার নির্দেশনা চেয়েছিলোম। আদালত আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারি কোষাগারে বকেয়া টাকা জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে।”

সরকার নির্ধারিত সাভারের ট্যানারি শিল্প এলাকায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪৩টি ট্যানারি স্থানান্তর হয়েছে বলে বেনারকে জানান নদী দখল ও দূষণ মুক্তকরণ সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইছ উল আলম মণ্ডল।

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী এবং নদী সংলগ্ন হাজারীবাগ এলাকা দূষণমুক্ত করা এবং চামড়াশিল্পের পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ১৯৯ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ট্যানারি কারখানাগুলোকে নতুন শিল্প অঞ্চলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন