প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ধানের ব্লাস্ট রোগ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-05-09
Share
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত ধান গাছ দেখাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত ধান গাছ দেখাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক। ০১ মে ২০১৮।
বেনারনিউজ

গত বছর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ধানের ব্লাস্ট রোগ এ বছর প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মহসিন বেনারকে বলেন, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৯টি জেলায় ধানের ব্লাস্ট রোগ রোগ ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, রোগের প্রাদুর্ভাব ‘নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে’।

তবে মহাপরিচালক বলেন, এ বছর রোগটির বিস্তার ভবিষ্যতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ধানের ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, ধানে অতিরিক্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহার ব্লাস্ট রোগের বিস্তার বাড়িয়ে দেয়।

কৃষি গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ কারণ ছাড়াও সঠিক সময়ে সঠিক কীটনাশক ব্যবহার না করলে ধানের ব্লাস্ট রোগের ঝুঁকি বাড়ে। আর সে ক্ষেত্রে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সঙ্গনিরোধ শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বীজ আমদানিতে সঙ্গনিরোধ বিভাগের কোনো কার্যকর ভূমিকা না থাকার ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে বীজ আমদানি হয়। আর সে কারণেই ধানের ব্লাস্ট রোগের বিস্তার ঘটছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহসিন বেনারকে বলেন, “গত বছর ব্লাস্ট রোগের বিস্তার ঘটে মূলত দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। এর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের দুটি মিলিয়ে মোট নয়/দশটি জেলাতে ব্লাস্ট ধরা পড়ে। কিন্তু এ বছর এখন পর্যন্ত ৪৯ জেলায় ব্লাস্ট ধরা পড়েছে।”

তিনি বলেন, “তবে ব্লাস্ট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। এ বছর মূলত ব্রি-২৮ জাতের ধানে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করে। সেই জাতের ধান কেটে ফেলা হয়েছে। তবে, হ্যাঁ ভবিষ্যতে এর প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এই রোগের বিস্তার ঘটে।”

মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে ইউরিয়া সার ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। আর সেকারণে ব্লাস্টের বিস্তার ঘটতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় সবচেয়ে বেশি এলাকাজুড়ে ব্লাস্ট রোগের বিস্তার ঘটেছে। এই জেলায় ১৬১ হেক্টর জমি ব্লাস্টে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা। সেখানে ১০৬ হেক্টর জমি ব্লাস্টে আক্রান্ত।

কিশোরগঞ্জ জেলায় ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত একটি ধানখেত। ০১ মে ২০১৮।
কিশোরগঞ্জ জেলায় ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত একটি ধানখেত। ০১ মে ২০১৮।
বেনারনিউজ

 

ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার কৃষক

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক সাহাবুদ্দিন ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষ করেছিলেন। তিনি আশা করছিলেন, এই মৌসুমে কমপক্ষে ৫০ মণ ধান পাবেন। তবে, ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে তার পুরো জমির ধান চিটা হয়ে গেছে।

তিনি বেনারকে বলেন, “ফলন ভালো হয় শুনে ১৪ হাজার টাকা খরচ করে বি-২৮ ধান চাষ করি। কিন্তু ব্লাস্টে আমার সব শেষ। চিন্তা করছি, এ বছর কী খাব।”

শুধু শাহাবুদ্দিনই নন, এলাকার শত শত কৃষক তাঁদের স্বপ্নের ধানখেতে ব্লাস্ট রোগে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।

জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে, ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৮ মেট্রিক টন চাউল। এর মধ্যে ব্রি ২৮ ধান আবাদ হয়েছে ৮৫ হাজার ৫২২ হেক্টর জমিতে।

আর এই বি-২৮ জাতেই ব্লাস্ট রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রোগতত্ত্ববিদ ড. মো. মোস্তফা কামাল বেনারকে বলেন, গত বছর ধানের ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ছিল। দিনে উচ্চ তাপমাত্রা ও রাতে নিম্ন তাপমাত্রার কারণে ব্লাস্ট রোগের ফাঙ্গাস বংশ বিস্তার করে।

জলবায়ু পরিবর্তন ব্লাস্ট রোগের অন্যতম কারণ বলে জানান ড. কামাল। তিনি বলেন, “এ দেশে ছয়টি কাল। কিন্তু কোন কাল কখন আসে আমরা বুঝতে পারি না। এখন অধিকাংশ দিনের সকালে কুয়াশা দেখা যায়। আগে এমনটি হতো না। আর কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ব্লাস্ট ছড়ায় বেশি।”

তিনি বলেন, ব্লাস্ট বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। ব্লাস্ট শুধু ব্রি-২৮ নয়। সকল জাতের ধানেই ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হতে পারে। কৃষক সচেতন হলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক ও উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ শাখার কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ বেনারকে বলেন, গত বছর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া ও যশোর ও উত্তরাঞ্চলের বগুড়া জেলায় রাইস ব্লাস্ট ধরা পড়ে।

“এ বছর প্রায় সারা দেশে তা ছড়িয়ে পড়েছে। এ বছর হয়তো ব্লাস্টে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব আমরা। কিন্তু ভবিষ্যতে এর আক্রমণ আরও বাড়বে। তখন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।”

২০১৫ সালে গমে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তার পরের বছর ধান গাছের ব্লাস্টের আক্রমণ হয়। এরপর থেকে আক্রান্ত এলাকার পরিমাণ বাড়ছে।

আহসান উল্লাহ বলেন, “আমরা কোনো প্রকার কার্যকর বিধিনিষেধ ছাড়াই ধান ও গমের বীজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকি। কেউ দেখছেন না, যে বীজগুলো জীবাণু বহন করছে কি না।”

তাঁর মতে, দেশের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সময় এসেছে। অন্যথায় দেশকে অনেক খেসারত দিতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন