ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ বহিস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-10-29
Share
201029_Tithy_sarkar_620.jpg জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিথি সরকার। ফাইল ছবি।
[সৌজন্যে: তিথির পরিবার]

ফেসবুকে ইসলামের মহানবী সম্পর্কে কটুক্তির অভিযোগে চারদিন আগে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে বহিস্কৃত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ছাত্রীকে পাঁচদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার।

নিখোঁজ তিথি সরকার জবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বোন স্মৃতি সরকারের অভিযোগ, পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াজেদ আলীর সাথে দেখা করতে রোববার সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তিথি নিখোঁজ।

বাসা থেকে হেঁটে গেলেও ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ওই থানায় পৌঁছানো যায় উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার স্মৃতি বেনারকে বলেন, “তিথি বের হওয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যেই এক ব্যক্তি উপ-পরিদর্শক (এসআই) পরিচয়ে আমার মোবাইলে ফোন করে জানান, তিথি থানায় পৌঁছেনি। ওর মোবাইল নম্বরটিও তখন থেকে বন্ধ রয়েছে।”

তবে ওসি ওয়াজেদ বেনারকে বলেন, “আমার সাথে তাঁর (তিথি) দেখা করার কথা ছিল না। তবে আমাদের এক এসআইয়ের সাথে নিজের ‘ডিভাইস’ নিয়ে ‘সাইবার ক্রাইম ইউনিটে’ যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সে আসেনি।”

“মঙ্গলবার তাঁর বোন আমাদের জানান তিথিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন। তখন থেকেই খোঁজ শুরু করেছি আমরা। তবে সন্ধান মেলেনি,” বলেন তিনি।

ওসির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার পল্লবী থানায় ‘ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকড’ হওয়ার কথা জানিয়ে একটি জিডি করেছিলেন তিথি। যেখানে তিনি এই ইস্যুতে ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ওই ঘটনা তদন্তের জন্য সাইবার ক্রাইম ইউনিটে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর।

পরদিনই ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তির অভিযোগ এনে তিথিকে মঙ্গলবারের মধ্যে বহিষ্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিক্ষোভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রসংগঠন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামিক শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ও আহলে হাদিসের মতো ধর্মভিত্তিক সংগঠনের কর্মীরা ওই বিক্ষোভে যোগ দেয়।

গত সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. ওহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত আদেশে তিথিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়। ওই আদেশে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সম্পর্কে কটুক্তি করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে তাঁকে কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, তা লিখিতভাবে ১০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারকে জানাতে বলা হয়েছে। অপর এক আদেশে এই ঘটনা তদন্ত করে তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ওই কমিটির প্রধান ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. একেএম মনিরুজ্জামান বেনারকে বলেন, “তিথির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আমরা জানি না।”

তদন্ত সম্পন্ন করতে তিথির বক্তব্যও প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিথি বিশ্ব হিন্দু সংগ্রাম পরিষদের বাংলাদেশ শাখার একজন সংগঠক। ভারতীয় এই সংগঠনের সভাপতি শিপন কুমার বসু কোলকাতা থেকে মুঠোফোনে বেনারকে জানান, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতেও তাঁর সঙ্গে তিথির কথা হয়েছে। তখনও সে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছিল।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদকও ছিলেন তিথি।

তিথির পরিবারকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঢাকা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার রায় শিশির বেনারকে বলেন, “এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে।”

“এই দেশের কোনো শিক্ষিত হিন্দু সুস্থ মস্তিস্কে মহানবীকে নিয়ে কটুক্তি করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়,” বলেন তিনি।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বেনারকে বলেন, “এটা সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের একটি নতুন কৌশল। ২০১১ থেকে বারবার এর প্রয়োগ আমরা দেখতে পাচ্ছি।”

“যারা বাংলাদেশে ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে আইন পাশ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিয়ে আসছে, তারাই এই কাজগুলো করছে,” যোগ করেন মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এই আইনজীবী।

আরো তিন শিক্ষার্থী বহিস্কার

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) হিন্দু দুই শিক্ষার্থীকে বুধবার একই কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিস্কৃতরা হলেন পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রতীক মজুমদার এবং ফার্মেসি বিভাগের দীপ্ত পাল।

প্রতীকের নিকটাত্মীয় কনক মজুমদার বেনারকে বলেন, “এ ঘটনায় প্রতীক এবং তাঁর পরিবার খুবই আতঙ্কিত।”

নোবিপ্রবির রেজিস্ট্রার মো. আবুল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে মহানবী ও ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটুক্তির মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করায় ওই দুই শিক্ষার্থীকে অস্থায়ী বহিষ্কার এবং তাঁদের আবাসিক হলের সিট বাতিল করার কথা উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ফেসবুকে হিন্দু দেবদেবী নিয়ে কটুক্তির অভিযোগে শনিবার বহিস্কৃত হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল হাওলাদার। এই দুটি ঘটনায়ও তদন্ত করে অভিযুক্তদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

“অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘একাউন্ট হ্যাক’ করে, এমনকি ভুয়া ও নকল ‘একাউন্ট তৈরি করে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে,” বেনারকে বলেন নূর খান লিটন।

এসব ঘটনায় সংখ্যালঘুরাই বেশি আক্রান্ত হয়েছেন উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এই সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “এ জাতীয় ঘটনা প্রকারান্তরের সামাজিক অসহিষ্ণুতারই প্রকাশ।”

সংখ্যালঘু শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বেনারকে বলেন, “ফেসবুকে কোরান অবমাননার অভিযোগে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পৌর শহরের মোজাফফর নগরে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ুয়া দিপ্তী দাসকে (১৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, তাঁর বাবা দিলীপ কুমার দাস।

তিনি জানান, এ ব্যাপারে বুধবার পার্বতীপুর মডেল থানায় অভিযোগ করেন পারভেজ নামের এক তরুণ। এরই প্রেক্ষিতে দিপ্তীকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ বুঝতে পরে সে হ্যাকিংয়ের শিকার।

“তবুও মুসুল্লিদের চাপে পুলিশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বৃহস্পতিবার তাঁকে দিনাজপুর জেলা আদালতে পাঠানো হয়,” বলেন মনীন্দ্র।

এর আগে দিপ্তীকে ছেড়ে দেওয়া হলে স্থানীয় কয়েকশ মুসল্লি উত্তেজিত হয়ে দিপ্তীদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি থানার ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় পুলিশের ছয় সদস্য আহত হয়েছেন।

আক্রান্ত সংখ্যালঘু পরিবারটির নিরাপত্তা জোরদারের কথা জানিয়ে পাবর্তীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাম্মৎ শাহনাজ মিথুন মুন্নী বেনারকে বলেন, “বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।”

পৃথক মামলায় আরিফুল ইসলাম (৩৩) ও আফনান হিমেল (১৫) নামের দুই হামলাকারীকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

“ইতিপূর্বে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পাবনার সাঁথিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এবং ভোলার বোরহানউদ্দিনে একইভাবে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা ও সহিংসতা সৃষ্টি করা হয়েছে,” বলেন রানা দাশগুপ্ত।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন