অভিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় বৈশ্বিক কাঠামো তৈরিতে ঐকমত্য

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.12.12
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
অভিবাসীদের স্বার্থ রক্ষা লিবিয়ার একটি সরকারি শিবিরে অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিক। জাওয়িয়াহ, লিবিয়া, ৩১ আগস্ট, ২০১৬।
AFP

অভিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় বৈশ্বিক কাঠামো তৈরিতে একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে নবম গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জিএফএমডি)। তবে এ কাঠামোর অবয়ব কেমন হবে সে বিষয়ে এখনো একমত হতে পারেনি সদস্য রাষ্ট্রগুলো।

অভিবাসন নিয়ে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনটির এবারের আয়োজক ছিল বিশ্বের  অন্যতম জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ, বাংলাদেশ।  ঢাকায় গত ১০ ডিসেম্বর এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের ১৩০টি দেশ থেকে আসা প্রায় আট শতাধিক প্রতিনিধি এতে অংশ নেন।

এ বছরের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেন্টস’ শীর্ষক বৈঠকে বিশ্ব নেতারা অভিবাসীদের সুরক্ষায় একটি বৈশ্বিক কাঠামো প্রণয়নের বিষয়ে ঐকমত্য হন। ২০১৮ সালে এ বিষয়ে একটি কম্প্যাক্ট অনুমোদন করার আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশই এই চুক্তির প্রস্তাবক। এবারের জিএফএমডিতে এই কমপ্যাক্ট তৈরির বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।

নবম জিএফএমডি সম্মেলনে অভিবাসন ও উন্নয়নের অর্থনীতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও সুশাসন এই তিনটি বিষয়ে নিরাপদ অভিবাসনের জন্য করণীয় সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ বিষয়ে সমাপনী অনুষ্ঠানের পরে নবম জিএফএমডি চেয়ার ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, “অভিবাসীদের সুরক্ষার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। অভিবাসী শ্রমিক থেকে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা উদ্বাস্তু হয়, তাদেরও অধিকার সংরক্ষণের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন।”

“এবারের জিএফএমডি সম্মেলনে প্রথমবারের মতো সদস্যদেশগুলো অভিবাসন বিষয়ে একটি বৈশ্বিক কাঠামো তৈরিতে একমত হয়েছে,” জানান তিনি।

কেমন হবে এই বৈশ্বিক কাঠামো

শুরু থেকেই অভিবাসীদের ‍সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোনো দ্বিমত ছিল না। তবে এর অবয়বটা কেমন হবে- সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছিল সেটাই।

এ বিষয়ে মো. শহীদুল হক বলেন,“কীভাবে কাঠামোটিকে আইনি বাধ্যবাধকতায় আনা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কোনো কারণে আমরা যদি এ বিষয়ে একমত হতে না পারি, তাহলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার  (এসডিজি’র) মতো কোনো কিছু করা যায় কি না, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সব দেশ যার অংশিদারিত্ব নেবে অথবা এর কিছু অংশ বাধ্যতামূলক এবং কিছু অংশ অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে হবে।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশের দেওয়া প্রস্তাবগুলো যাচাই বাছাই চলছে। আগামী দু’বছর ধরে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে শহীদুল হক বেনারকে বলেন, “অভিবাসনের বৈশ্বিক কাঠামোর অবয়ব নিয়ে এবারের সম্মেলনে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে মাত্র। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে এখনো অনেক পথ যেতে হবে।”

নেতৃত্বে বাংলাদেশ

অভিবাসনকে নির্দিষ্ট কাঠামোতে আনার প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশ অভিবাসন খাতেও বিশ্ব নেতৃত্বের স্থানে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের এ প্রস্তাব বৈশ্বিক অভিবাসন খাতে বিরাট একটি পরিবর্তন আনতে চলেছে।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর অধিকার কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অভিবাসীদের রক্ষার আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ। সফলভাবে জিএফএডি আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আমরা সে বার্তাই বিশ্বকে দিলাম।”

তিনি বলেন, ‘এই অধিবেশনে সবাই একমত যে অভিবাসনকে নিরাপদ করতে হবে। সুশৃঙ্খল করতে হবে। অভিবাসন খাতে সুশাসন আনতে হবে। আর সেটি করতে হলে আন্তর্জাতিক একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে।”

এদিকে এ সম্মেলনের মাধ্যমে আসা সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নও বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এ প্রসঙ্গে অভিবাসীদের অধিকার বিষয়ক সংগঠন ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ ১৬৯টি জনশক্তি রপ্তানি করছে। অনেক সময় আমাদের শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে নানা কারণে অনিবন্ধিত হয়ে যায়, তাদেরকে অবৈধ বলা হয়, ক্রিমিনাল চার্জ আনা হয়, ডিটেনশনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে মুক্তি চাচ্ছিলাম।”

তিনি বলেন, “এবারের সম্মলনে পরিষ্কারভাবে এসেছে- যেকোনো অবস্থাতে একজন অভিবাসী সংশ্লিষ্ট দেশে নিরাপত্তা পাবে। তারা যেখানে যে স্ট্যাটাসেই থাকুক না কেন। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শ্রমিকরাও এ মর্যাদা পাবে।”

সরকারের হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮০ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। যাদের পাঠানো অর্থে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

অভিবাসন খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব

অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবসময় আলোচিত বিষয় অভিবাসন খরচ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের অভিবাসী শ্রমিকরা অতিরিক্তি অভিবাসন খরচের কারণে সর্বস্ব হারাচ্ছেন।

এবারের জিএফএমডি সম্মেলনের বিভিন্ন আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে এ বিষয়টি।

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় প্রসঙ্গে জিএফএমডি সম্মেলনের ফাঁকে আইওএম মহাপরিচালক উইলিয়াম লেইসি সুইং সাংবাদিকদের বলেন, “অভিবাসন খরচ কোনোভাবেই অভিবাসী শ্রমিকের বহন করা উচিত নয়। অভিবাসী শ্রমিকরা যাদের জন্য কাজ করবেন, সেই সব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরই এ খরচ বহন করা উচিত।”

এ বিষয়টি শ্রমিক রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, “অভিবাসন খরচ কমানোর বিষয়ে বেশ কিছু নতুন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গ্লোবাল কম্প্যাক্টের মধ্যে এটি বিশেষভাবে উল্লেখ থাকবে।”

এবারের সম্মেলনে প্রথমবারের মত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও প্রাইভেট সেক্টর অংশ নিয়েছে। অভিবাসন খরচ কমানোর বিষয়ে যাদের ভূমিকা অন্যতম বলে মনে করা হয়। সম্মেলন শেষে তারাও অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আইনী কাঠামোয় আনার পক্ষে মত দেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও জনশক্তি রপ্তানিকারক শামীম আহমেদ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “অভিবাসন খরচ কমানোই শুধু নয়, তাদের মানবাধিকার, নায্য পাওনা, কর্মক্ষেত্রের অধিকার সবই দিতে হবে। সকল সরকার, সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী কমিউনিটি সবাই এ বিষয়ে একমত।”

অন্যরকম এক ব্রান্ডিং

গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পরে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিভিন্ন দেশ। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতা জারির ফলে বাতিল হয়ে যায় কয়েকটি বড় সম্মেলন।

সেই পরিস্থিতিতে জিএফএমডি সম্মেলনে বিদেশি অতিথি আসা নিয়ে শঙ্কা দেখা যায়। তবে শেষমেষ রেকরর্ড সংখ্যক অতিথি সমাগমে সফলভাবে শেষ হয়েছে নবম জিএফএমডি। যার মাধ্যমে অন্যরকম ব্রান্ডিং হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশের ছয়শ সরকারি ও দুইশর বেশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।