আদালতের রায়: ‘আমৃত্যু’ বলা না হলে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-12-01
Share
আদালতের রায়: ‘আমৃত্যু’ বলা না হলে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড ঢাকার হাই কোর্টের প্রবেশমুখে এক ব্যক্তিকে তল্লাশি করছেন র‍্যাবের এক সদস্য। ৩০ নভেম্বর ২০০৫।
[রয়টার্স]

রায়ে ‘আমৃত্যু’ উল্লেখ না থাকলে যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ ৩০ বছর হিসেবে গণ্য হবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০০১ সালের একটি হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের আদেশ পুনর্বিবেচনা করে মঙ্গলবার এমন রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। 

রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়ে বলেন, “এখন শুধু তাঁদেরকেই আমরণ জেলে থাকতে হবে, যাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে ‘আমৃত্যু’ উল্লেখ থাকবে। অন্যরা সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত সাজা ভোগ করবেন।” 

“যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর না আমৃত্যু কারাদণ্ড, সেই বিভ্রান্তির অবসান হলো এই রায়ের মধ্য দিয়ে। তবে এক্ষেত্রে যাবজ্জীবনের দুই ধরনের মেয়াদ থেকে গেলো,” বেনারকে বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের জেষ্ঠ্য প্রভাষক ব্যারিস্টার আরাফাত হোসেন খান। 

তাঁর মতে, “একই সাজায় কারো আমৃত্যু, আবার কারো ৩০ বছর শাস্তিভোগের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক। যদিও পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুষ্পষ্ট অভিমত থাকলে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না।” 

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চের দেওয়া মঙ্গলবারের ওই সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছে, দণ্ডবিধির ৪৫ ও ৫৩ ধারার সঙ্গে ৫৫ ও ৫৭ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-ক একসঙ্গে পড়া হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে বোঝাবে ৩০ বছরের কারাবাস। 

তবে যদি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাউকে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ দেয় তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-এ এর বিধানটি (৩০ বছরের কারাদণ্ড) এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। 

২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সাভারের ব্যবসায়ী জামান ইয়াসিন হত্যার ঘটনায় তিন আসামি আনোয়ার হোসেন, আতাউর রহমান মৃধা ও কামরুল ইসলামকে ২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।

ওই সময় কামরুল ছিলেন পলাতক। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আতাউর ও আনোয়ার। শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। 

এরপর আতাউর ও আনোয়ার আপিল বিভাগে গেলে ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করে। ওই রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড। 

ওই বছরের নভেম্বরে রায়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন আতাউর। এরই প্রেক্ষিতে যাবজ্জীবনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে মঙ্গলবারের রায় ঘোষণা করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ। 

'প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে'

যাবজ্জীবনের রায়ে ‘আমৃত্যু’ উল্লেখ করার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিবাদী পক্ষের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। রায়ের পর এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমরা রায়টি দ্বিতীয়বারের মতো পুনর্বিবেচনার আবেদন করব।” 

তাঁর সহযোগী আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনির বেনারকে বলেন, “আমৃত্যু উল্লেখ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-ক এবং কারাবিধির যে রেয়াতের বিধান তার আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না।” 

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কারাবন্দিরা সদাচরণ ও যথাযথ কারাবিধি পালনের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদের ‘দণ্ড হ্রাস’ বা রেয়াত অর্জন করতে পারেন। 

সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে জেল কর্তৃপক্ষ বন্দিদের দণ্ডের মেয়াদ সর্বোচ্চ চার ভাগের একভাগ পর্যন্ত কমাতে পারেন। ফলে একজন কারাবন্দির কার্যকর বছরের মেয়াদ নেমে আসতে পারে নয় মাস পর্যন্ত। 

আইনজীবীদের মতে, সাধারণত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ৩০ বছর হলেও ‘দণ্ড হ্রাস’ এর পর মেয়াদ নেমে আসতে পারে সাড়ে ২২ বছর পর্যন্ত। 

এর আগে অন্য একটি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চের এক রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ সাড়ে ২২ বছর কারাদণ্ড। 

এদিকে নতুন রায় অনুযায়ী আমৃত্যু কারাদণ্ড কার্যকর করতে হলে “ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি এবং কারাবিধির কিছু ধারা সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে,” বলে মন্তব্য করেন ব্যারিস্টার আরাফাত। 

নতুন রায় অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সব আসামির ব্যাপারে কারা কর্তৃপক্ষকে কবে নাগাদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে জানতে চাইলে “আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশটির পরিভাষা ভালো করে দেখে বলতে হবে,” বলে বেনারকে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। 

এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুনকে বেনারের পক্ষ থেকে ইমেইল করে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। 

তবে “যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড,” উল্লেখ করে আপিল বিভাগের আগের রায়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির কারণে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত যেসব আসামির নির্ধারিত সময় সাজা খাটা হয়ে গেছে, “তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁদের ছেড়ে দিতে পারেনি,” বলে বেনারকে জানান আসামি পক্ষের আইনজীবী মনির। 

তাঁর মতে, মঙ্গলবারের রায়ের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশিত হওয়ার পর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এমন আসামিদের কারা কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দিতে পারবে।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন