জুলহাজ-তনয় হত্যা: চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াসহ ছয় অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড

শরীফ খিয়াম
2021.08.31
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
জুলহাজ-তনয় হত্যা: চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াসহ ছয় অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় থাকার কারণে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্যদের রায়ের পর এজলাস থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ৩১ আগস্ট ২০২১।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার জন্যই ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার কলাবাগানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম জুলহাজ মান্নান ও খন্দকার মাহবুব রাব্বী তন্ময় ওরফে তনয়কে হত্যা করে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে আদালত। 

ওই জোড়া খুনের মামলার রায়ে মঙ্গলবার অভিযুক্ত আট আসামির ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড ও অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুইজনকে খালাস দেয় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল। 

দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে চারজন আটক ও দুজন পলাতক। খালাস পাওয়া দুইজনও পলাতক।

বিচারক মজিবুর রহমানের দেওয়া এই রায় সংক্রান্ত নথিপত্রের একাংশের অনুলিপি বেনারের হাতে এসেছে। 

এতে বলা হয়, “সাক্ষ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় আসামিরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য এবং সমকামীদের নিয়ে র‌্যালি করাসহ সমকামীদের সমাজে প্রতিষ্ঠার দায়ে ‘ভিকটিম’ জুলহাজ মান্নান ও খন্দকার মাহবুব রাব্বী তন্ময় ওরফে তনয়কে তারা হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।”

প্রসঙ্গত, আনসার আল ইসলাম এর আগে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নামে পরিচিত ছিল। 

“এই মামলার অভিযুক্ত আসামিদের অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে মতামত প্রকাশ ও স্বাধীন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা, এ জন্য জুলহাজ ও তনয়কে হত্যা করা হয়,” বলেন বিচারক। 

তাঁর মতে, এক্ষেত্রে অভিযুক্ত আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট-বড়ো করে দেখার সুযোগ নেই। 

“অভিযুক্ত আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে। কাজেই এই আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না,” উল্লেখ করে আদালত জানায়, ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

“এতে একদিকে নিহতের আত্মীয়রা শান্তি পাবে এবং ভবিষ্যতে (কেউ) এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করতে ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে,” যোগ করেন বিচারক। 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির মধ্যে চারজন- মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন (২৫), আরাফাত রহমান (২৪), মো. শেখ আব্দুল্লাহ (২৭) ও আসাদুল্লাহ ওরফে ফয়জুল (২৫) রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। 

দণ্ডপ্রাপ্ত বাকি দুজনের মধ্যে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) মতাদর্শ অনুসরণকারী জঙ্গি সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান ও সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া (৪২) ও আকরাম হোসেন (৩০) পলাতক। 

একই আদালতে গত ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলা এবং প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার মামলার রায়েও জিয়া ও আকরাম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। 

‘সন্দেহাতীতভাবে’ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পলাতক আসামি সাব্বিরুল হক চৌধুরী (২৪) ও জুনায়েদ আহম্মদকে (২৬) বেকসুর খালাসের আদেশ দিয়েছে আদালত। 

এদিকে সারাদেশে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট পলাতক জিয়া ও আকরামকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনস্) মো. ফারুক হোসেন। 

২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সংগঠিত নয়টি ‘টার্গেট কিলিং’-এর সাথে জিয়ার সম্পৃক্ততার কথা শোনা গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে মোট কতগুলো মামলা রয়েছে তা জানাতে পারেননি পুলিশ কর্মকর্তারা। 

কলাবাগান লেক সার্কাস লাল ফকিরের মাজার এলাকার ৩৫ নম্বর বাসা আছিয়া নিবাসের দ্বিতীয় তলায় খুন হন জুলহাজ-তনয়।

সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাজ এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনার প্রটোকল কর্মকর্তা হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

তাঁরা দুজনেই ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের প্রথম সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার বিষয়ক পত্রিকা ‘রূপবান’ প্রকাশ ও প্রচারের সাথে জড়িত ছিলেন। 

Xulhaz-Tonoy-02.jpeg
যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় থাকার কারণে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্যদের রায়ের পর এজলাস থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ৩১ আগস্ট ২০২১। [শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট, আসামিপক্ষ যাবে উচ্চ আদালতে 

রায়ের পর এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম ছারোয়ার খান জাকির বেনারকে বলেন, “আমরা আদালতের এই রায়ে সন্তুষ্ট।” 

খালাসপ্রাপ্ত পলাতক দুই আসামির শাস্তি চেয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে কি না সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। 

অপরদিকে “এই মামলায় আমরা ন্যায়বিচার পাইনি,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এবিএম খায়রুল ইসলাম লিটন ও এম নজরুল ইসলাম। 

“মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়নি রাষ্ট্রপক্ষ,” বেনারকে বলেন লিটন। 

“ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ-আদালতে আপিল দায়ের করব,” বলেন নজরুল। 

স্বজনরা যা বললেন

“দীর্ঘদিন পর আজ রায় হয়েছে,” উল্লেখ করে হত্যা মামলাটির বাদী জুলহাজের বড়ভাই মিনহাজ মান্নান ইমন মঙ্গলবার দুপুরে বেনারকে বলেন, “ঘাতকরা আমার অজ্ঞাত। আমি কাউকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারিনি। তাই রায়ে সন্তোষ বা অসন্তোষ প্রকাশের অবকাশ আমার নাই।” 

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল যারা পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন, এক্ষেত্রে তাঁদের মতামত নেওয়াই ভালো হবে।” 

অন্যদিকে, নিম্ন-আদালতের এই ফাঁসির আদেশ “উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে এবং তা কার্যকর হবে” এমনটাই প্রত্যাশা করেন তনয়ের মামা মাহফুজুর রহমান খান। 

“তবে মূল অপরাধী কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। জিয়াকে ধরতে না পারলে এ জাতীয় কর্মকাণ্ড কোনো সময়ই থামানো যাবে না,” বেনারকে বলেন মাহফুজুর রহমান। 

ফাঁসি শুনেও হাসি 

রায়ের পরপরই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বেনারকে বলেন, “আমরা লক্ষ্য করলাম, রায় শোনার পরও তাদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারা হাসছিল। কোনো অনুশোচনা নেই।” 

“তারা যে কতটা ভয়ংকর তা তাদের এই আচরণ দেখেও বোঝা যায়,” যোগ করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। 

এজলাস কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজনকেই হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে। গত সপ্তাহে এই মামলারই যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার তারিখ শুনে কারাগারে ফেরার পথেও তাঁদের বেশ উৎফুল্ল দেখা গেছে। 

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা মামলায় নিজেদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনা ছয় জঙ্গিকেও প্রিজন ভ্যানে ফিরে হাসি মুখে একে অপরকে আলিঙ্গন করতে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। 

এ ব্যাপারে অপরাধ বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বেনারকে বলেন, “জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সদস্যরা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধর্মান্ধ হয়েছে বা যে আদর্শগত জায়গা থেকে উজ্জীবিত হয়ে জঙ্গিবাদে সংযুক্ত, সেই মনোবৃত্তি থেকেই শাস্তিটাকে তারা এক ধরনের পুরস্কার বলে মনে করছে এবং এই পরিস্থিতিটা তারা উপভোগ করছে।” 

জঙ্গিদের কাছে এসবই অতি-আধ্যাত্মিক বিষয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইহলোককে তুচ্ছজ্ঞান করে তারা মনে করছে- মৃত্যুদণ্ড পেয়ে শহীদের মর্যাদা নিয়ে পরলোকে যাবে। এরপর তারা বেহেশত পাবে, যেখানে তাদের পুরস্কৃত করা হবে। এভাবেই তারা ‘মোটিভেটেড’ (অনুপ্রাণিত) হয়েছে।” 

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপকের দাবি, “পরকালে পুরস্কৃত হওয়ার মনোবাসনা থেকে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণেই বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও সেটাকে তারা আনন্দ উল্লাসে বরণ করে নিচ্ছে এবং এই বিচার নিয়ে হাসি-তামাশা করছে।” 

“জঙ্গিবাদে যারা বিশ্বাস করে তারা দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে আসলে গ্রাহ্যই করে না। কারণ তারা মনে করে, শাস্তি কার্যকর হওয়া মাত্রই তারা পুরস্কৃত হবে। জঙ্গিবাদী কাজে প্রাণ হারানোকে তারা শহীদী বা সম্মানজনক মৃত্যু মনে করে,” বেনারকে বলেন আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার আরাফাত হোসেন খান।

“এই অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই তারা জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হয় এবং লিপ্ত থাকে,” যোগ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আরাফাত।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন