অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যার দায়ে জেএমবির দুই সদস্যের ফাঁসি

কামরান রেজা চৌধুরী
2018.05.08
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের আসামিদের রাজশাহীর আদালতে হাজির করা হয়। অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাসকাওয়াত হাসানকে রায়ের আগে রাজশাহীর আদালতে হাজির করা হয়। ৮ মে ২০১৮।
বেনারনিউজ

দুই বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে তাঁর বাসার কাছে কুপিয়ে হত্যার দায়ে জঙ্গি গোষ্ঠী জেএমবি’র দুই সদস্যের ফাঁসির দণ্ডাদেশ দিয়েছে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালত।

মঙ্গলবার বিচারক শিরিন কবিতা আক্তার এই রায় ঘোষণা করেন। হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অপরাধে আরও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

রায়ে বিচারক পাঁচ জঙ্গির সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (নব্য-জেএমবি) সদস্য বলে জানিয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া আসামিরা হলো: মূল খুনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র শরিফুল ইসলাম ও বগুড়ার শিবগঞ্জের মাসকাওয়াত হাসান ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে সাকিব।

নীলফামারীর মিয়াপাড়ার রহমত উল্লাহ, রাজশাহী মহানগরীর নারকেলবাড়িয়া এলাকার আব্দুস সাত্তার ও তার ছেলে রিপন আলী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।

আদালত তার রায়ে জানায়, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে অধ্যাপক সিদ্দিকীকে হত্যা করা হয়।

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী। ফাইল ছবি।
অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী। ফাইল ছবি।
বেনারনিউজ
রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি এন্তাজুল হক বাবু মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, আদালত রায়ে বলেছে, প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে ব্যক্তিগত কারণে হত্যা করা হয়নি। মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, “তাঁকে হত্যার ছয় মাস আগে তাঁর ছাত্র ও হত্যার মূল আসামি শরিফুল তাঁকে ক্লাসে হুমকি দিয়ে বলে, ‘স্যার এই দিন থাকবে না; এ দেশে একদিন খিলাফত প্রতিষ্ঠা হবেই। আপনাকে দেখে নেব স্যার।’ আর দেখে নেওয়া মানেই, হত্যা।”

পিপি বাবু বলেন, এই মামলার মোট আট আসামির মধ্যে তিনজন বিভিন্ন সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে। তারা হলো: খায়রুল ইসলাম বাঁধন, নজরুল ইসলাম ওরফে হাসান ওরফে বাইক হাসান ও তারেক হাসান ওরফে নিলু ওরফে ওসমান।

আর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া শরিফুল বর্তমানে পলাতক।

বাবু বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাসকাওয়াত এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত তিনজন কারাগারে রয়েছে। তারা সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেয়নি; তবে তারা পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে বলে ‍তিনি জানান।

তিনি বলেন, অধ্যাপক সিদ্দিকী ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তমণা মানুষ; তিনি সাংস্কৃতিক চর্চা করতেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অসাম্প্রদায়িক ও সংস্কৃতিমনা হতে বলতেন।

পিপি বলেন, তাঁর নিজ গ্রাম বাগমারায় একটি গানের স্কুল গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। তিনি সেখানে গান চর্চা করতেন বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা। এছাড়া তিনি কোমল গান্ধার নামক একটি অসাম্প্রদায়িক ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতেন।

পিপি আরো জানান, অধ্যাপক সিদ্দিকী ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্টা ছিলেন। অধ্যাপক সিদ্দিকী ভালো সেতার বাজাতেন।

রায় ঘোষণার আগে আদালত প্রাঙ্গণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও নিহত শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন করে দাঁড়িয়েছিলেন। রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট বলে জানান।

উচ্চ আদালতে এই রায় বহাল থাকবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতভি বেনারকে বলেন, “আমরা সন্তষ্ট। তবে মূল হত্যাকারী শরিফুল ও মাসকাওয়াত এখনো ধরা পড়েনি। আমরা চাই উচ্চ আদালতে এই রায় বহাল থাকবে এবং এই জঙ্গিদের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর হবে।”

তাঁর ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন বেনারকে বলেন, “স্যার ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের অসাম্প্রদায়িক হতে অনুপ্রাণিত করে।”

২০১৫ সালের সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ইতালিয়ান নাগরিক তাভেল্লা সিজারকে ঢাকায় ও জাপানি নাগরিক কুনিও হোসিকে রংপুরে হত্যার মধ্য দিয়ে উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের মতাদর্শে বিশ্বাসী নব্য জেএমবি বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

এই জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের টার্গেটদের কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করত। সেই জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর হাতে ‘টার্গেটেড কিলিং’ এর শিকার হন অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী।

২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল সকালে রাজশাহী মহানগরীর শালবাগান এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে।

পুলিশ জানায়, দুজন যুবক একটি মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায়।

ইসলামিক স্টেটের রুমিয়া ম্যাগাজিন অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে ‘মুরতাদ’ বলে চিহ্নিত করে তাঁকে হত্যার দায় স্বীকার করে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইসলামিক স্টেটের উপস্থিতি অস্বীকার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য মতে হত্যাকারীরা দেশীয় উগ্রবাদী সংগঠন নব্য জেএমবি সদস্য।

মূল খুনি শরিফুলের বাড়িও বাগমারা উপজেলায়।

রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলা জঙ্গিদের আস্তানা হিসেবে চিহ্নিত। ২০০১-০২ সালে জেএমবি প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান ও তার সামরিক শাখার প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে ‘বাংলা ভাই’ বাগমারা ও তার আশপাশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁর আত্রাই, বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও নাটোরের নলডাঙ্গায় তারা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। তারা সেখানকার বামপন্থী চরমপন্থী ও প্রতিপক্ষের লোকদের সেখানে ধরে এনে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে ও জবাই করে হত্যা করত।

অধ্যাপক রেজাউল হত্যার পর রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় নিহতের পুত্র রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। শরিফুলকে ধরিয়ে দিতে রাজশাহী মহানগর পুলিশ দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তার হদিস মেলেনি।

হত্যাকাণ্ড তদন্ত করে ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর আটজনকে আসামি করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক রেজাউস সাদিক। আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করে বিচার কাজ চালায়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন