দশদিন পর তোলা হয়েছে তনুর লাশ, আন্দোলন অব্যাহত

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.03.30
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
160330-BD-tonu-620.jpg কলেজছাত্রী তনুর লাশ তোলার পর পুনরায় ময়নাতদন্ত করতে নেওয়া হচ্ছে। ৩০ মার্চ ২০১৬।
বেনার নিউজ

দাফনের দশদিন পর কবর খুঁড়ে তোলা হয়েছে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নির্মমভাবে নিহত কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ। আদালতের নির্দেশে লাশের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, সুরতহাল তৈরি এবং পুনরায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে তনুর লাশ বুধবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তনু হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ ও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করা হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন আন্দোলনে সেনানিবাসে ঘটা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে তনুকে নিজেদের ‘সন্তান’ দাবি করে তদন্ত প্রক্রিয়ায় বেসামরিক প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে সেনাবাহিনী।

মানবাধিকার কর্মীরাও বলছেন, তনু হত্যার বিচার নিয়ে সারা দেশ উদ্বিগ্ন। এ সময় সরকার ও সেনাবাহিনীর তরফ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য আসা জরুরি। একই সঙ্গে তনু হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে।

তনুর পুনঃ ময়নাতদন্ত

গত ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নিজের বাড়ির কয়েকশ গজের মধ্যে ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনুর লাশ পাওয়া যায়।খুনের আগে তনুকে ধর্ষণ করা হয়েছিল ধারণা করা হলেও প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ায় তা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আবারও ময়নাতদন্তের অনুমতি চাওয়া হয়। পুলিশের সে আবেদনে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে বুধবার তোলা হয় তনুর লাশ, একইদিন আবারও দাফন করা হয় মরদেহ।

তনুর বাবা মো. ইয়ার হোসেন, কুমিল্লার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবিদ হোসেন ও সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার নাজমুল করিম খানসহ গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা লাশ উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, “ঢাকা থেকে আসা সিআইডির কর্মকর্তারা আসার পর বেলা পৌনে ১২টার দিকে তনুর লাশ উত্তোলনের পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি মেডিকেল টিম তনুর লাশের অধিকতর আলামত সংগ্রহ করেন। এরপর বিকেল ৬টার দিকে মর্গ থেকে তনুর লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।”

লাশ তোলা থেকে পুনরায় দাফন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশের পাহারা ছিল।

এদিকে তনু হত্যার ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে। তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেনের করা মামলাটির তদন্ত দায়িত্ব প্রথমে থানা-পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও তা এখন ডিবির হাত ঘুরে সিআইডির ওপর ন্যস্ত হয়েছে।

এর আগে সোমবার তনুর পোশাকসহ পাওয়া কিছু আলামত পরীক্ষার জন্য ঢাকায় সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

সারা দেশে আন্দোলন অব্যাহত

এদিকে তনু হত্যার বিচার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। রোববার সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বুধবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং স্কুল–কলেজে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে।এ

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বেনারকে বলেন, “তনু হত্যার প্রতিবাদে প্রতিদিন বিক্ষোভ, মানববন্ধন চলছে। কিন্তু আসামি গ্রেপ্তারে সরকারের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অতি দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দিতে হবে। তা না হলে ‘গণজাগরণের’ ডাক দেওয়া হবে।”

এর আগে গত সোমবার অবিলম্বে তনু হত্যাকাণ্ডের  বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন অথবা তিনজন বিচারপতিকে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে—যারা তদন্ত করে তনু হত্যার প্রকৃত রহস্য বের করবেন।”

‘তনুর মৃত্যুতে প্রতিটি সেনাসদস্য ব্যথিত’

সেনানিবাস এলাকায় ঘটা তনু হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে জনমনে শঙ্কার প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। যেখানে তনুকে সেনাবাহিনীর ‘সন্তান’ দাবি করে এ ঘটনায় দোষীদের ধরতে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, “তনুর বাবা মো. ইয়ার হোসেন বিগত ৩০ বছর যাবৎ কুমিল্লা সেনানিবাস ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের একজন বেসামরিক কর্মচারী, যিনি আমাদের সেনা পরিবারেরই সদস্য এবং তনু কুমিল্লা সেনানিবাসে বড় হয়েছেন, ও আমাদেরই সন্তান। তনুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে প্রতিটি সেনাসদস্য দারুণভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত।”

কোনো কোনো মহল বিষয়টি নিয়ে ‘বিভ্রান্তি’ ছড়ানোর চেষ্টা করছে অভিযোগ করে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সবার ‘দায়িত্বশীল’ বক্তব্য ও প্রচার প্রত্যাশা করা হয়।

‘জনগণ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, সুষ্ঠু তদন্তের পক্ষে’

তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কোনোভাবেই এ আন্দোলন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়। তনু হত্যার বিচারের সুষ্ঠু তদন্তই সকলের দাবি।

এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান বেনারকে বলেন, “সেনানিবাসের মতো সংরক্ষিত এলাকাতে তনু হত্যাকাণ্ড হয়েছে, শুরু থেকে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের রাখঢাকও লক্ষ্য করা গেছে। তা ছাড়া হত্যাকাণ্ড ঘটার পরে সময় ক্ষেপণ হলেও আসামি আটক না হওয়া, গভীর রাতে তনুর বাবা মাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে গ্রাম থেকে সেনানিবাসে আনা, বারবার তদন্তকারী সংস্থার পরিবর্তনসহ কারণে নানা কারণে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “তবে এ ঘটনার সঙ্গে সেনাবাহিনী যুক্ত বলে কেউ দাবি করেনি। বিক্ষোভ হচ্ছে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য। এখানে সেনাবাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে কেউ এ কাজ করছে বলে আমি মনে করছি না। সুষ্ঠু বিচার চায় জনগণ। আর জনমনের সন্দেহ দূর করার জন্য সরকার ও সেনাবাহিনীর তরফ থেকে স্পষ্ট করা দরকার।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।