গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের বিচার চান তিন নোবেল জয়ী নারী

কামরান রেজা চৌধুরী ও তুষার তুহিন
2018.02.26
ঢাকা ও কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শনকালে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী ইয়েমেনী তোয়াক্কুল কারমান। উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শনকালে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী ইয়েমেনী তোয়াক্কুল কারমান। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
তুষার তুহিন/বেনারনিউজ

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে মিয়ানমার সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে রাখাইনে গণহত্যা চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিন নোবেল বিজয়ী নারী।

সোমবার কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে আশ্রিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই মন্তব্য করেন নোবেল বিজয়ী যুক্তরাজ্যের মেরেইড ম্যাগুয়ার, ইরানের শিরিন এবাদি এবং ইয়েমেনের তায়াক্কুল কারমান।

এসময় তিন নোবেল বিজয়ী গণহত্যার জন্য দায়ী মিয়ানমার সরকার ও অন্যান্যদের আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিসি) বিচার করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে ও তাঁদের সাথে কথা বলতে এই তিন নোবেল বিজয়ী রোববার বাংলাদেশ সফরে আসেন।

রোববার ও সোমবার তাঁরা একত্রে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে শরণার্থীদের কথা শোনেন। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা।

মেরেইড ম্যাগুয়ার বলেন, “বার্মার (মিয়ানমার) সরকার ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে।”

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ও দেশটির জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তায়াক্কুল কারমান বলেন, “এটা আমাদের জন্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য লজ্জার ব্যপার। আমরা চাই এই অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইসিসিতে বিচার করা হোক।”

ইরানের শিরিন এবাদি বলেন, “আমি আশা করি এই অপরাধের জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভেটো দেবে না।”

শরণার্থী পুনর্বাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালামের সঙ্গে মত বিনিময় করেন এই তিন নারী।

বৈঠক শেষে আবুল কালাম বলেন, “তিন নোবেল জয়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। এরপর তাঁদের কাছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পুরো চিত্র তুলে ধরা হয়।”

কমিশনার কালাম বলেন, তাঁরা মনে করেন, রাখাইন রাজ্যে পরিকল্পিতভাবে স্মরণকালের ভয়াবহ এ গণহত্যা চালানো হয়েছে।

প্রতিনিধি দলটি উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। তাঁরা সোমবার দিনব্যাপী ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। ঢাকার নারীপক্ষ নামক সংস্থার সহযোগিতায় তাঁদের বাংলাদেশ সফরের আয়োজন করা হয়েছে।

 

দুই রোহিঙ্গা আটক

রোববার বিকেলে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধুরছড়া ডি ব্লকে নোবেল বিজয়ীরা যে সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, ঠিক এমন সময় হঠাৎ ক্যাম্পের ভেতর থেকে একটি কিশোরের দল প্রত্যাবাসন বিরোধী বিক্ষোভ করে।

এ সময় ওই বিক্ষোভের ছবি তোলা ও বিক্ষোভে উৎসাহ দেবার অভিযোগে দুই রোহিঙ্গা যুবককে পুলিশ আটক করে।

“রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের নাগরিক নয়। তাঁদের বিক্ষোভ প্রদর্শন করার কোনো অধিকার নেই,” বেনারকে বলেন উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের।

ধৃতরা হলেন নিয়াজ মোহাম্মদ রনি (২২) এবং মনিরুজ্জামান মনির (২৪)।

আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান আবুল খায়ের।

নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে

মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ভয়ে সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া শূন্যরেখা থেকে শুক্রবার রাতে প্রায় ২ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এসব রোহিঙ্গা কোথায় গেছে, তা সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা নিশ্চিত নন। শনিবার সকালে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে বিষয়টি নিশ্চিত হন।

শরণার্থী পুনর্বাসন কমিশনার অফিসের সূত্র জানিয়েছে, ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের ফলে রোহিঙ্গারা এ দেশে পালিয়ে আসার ধারাবাহিকতায় প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা তুমব্রু শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়।

এসব রোহিঙ্গার খাদ্য, ওষুধপত্রসহ যাবতীয় ত্রাণসামগ্রী বিভিন্ন এনজিও সংস্থা নিয়মিত দিয়ে আসলেও শূন্যরেখার এপারে যেন আসতে না পারে সে ব্যাপারে বিজিবির কঠোর দিকনির্দেশনা ছিল বলে জানা গেছে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিনিধিদল শূন্যরেখা পরিদর্শন করে সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার ও পরিবারভিত্তিক তালিকা করার নির্দেশ দিলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীত সন্ত্রস্ত্র অবস্থার সৃষ্টি হয়।

এরপর দুই হাজার রোহিঙ্গা হঠাৎ করে রাতের আঁধারে শূন্যরেখা ত্যাগ করার ঘটনা নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

বান্দরবান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শফিউল আলম, বান্দরবানের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হোসেন ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এসএম সরওয়ার কামাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তুমব্রু কোনারপাড়া শূন্যরেখা রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শন করে দুই হাজার রোহিঙ্গা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিশ্চিত হন।

শূন্যরেখা থেকে যেসব রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে পালিয়ে গেছে তাদের খুঁজে বের করে বিজিবি ও পুলিশের হাতে সোপর্দ করার জন্য স্থানীয় জনসাধারণ ও জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।