রোহিঙ্গা শিবিরে বেড়েছে অগ্নিকাণ্ড, আগুনের কারণ চিহ্নিত করার ‘প্রযুক্তি’ বাংলাদেশে নেই

শরীফ খিয়াম ও আবদুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2021-04-20
Share
রোহিঙ্গা শিবিরে বেড়েছে অগ্নিকাণ্ড, আগুনের কারণ চিহ্নিত করার ‘প্রযুক্তি’ বাংলাদেশে নেই উখিয়ার বালুখালী শরণার্থী শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছে এক রোহিঙ্গা শিশু। ২৩ মার্চ ২০২১।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

সম্প্রতি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তাদের মতে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করার মতো প্রযুক্তি বাংলাদেশে নেই। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিড়ি-সিগারেট বা চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনার কথা তাঁরা জানালেও পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগে সম্প্রতি কয়েকজন শরণার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 

বিশ্লেষকদের মতে, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের উদ্দেশ্য না জানা পর্যন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেবার ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। 

গত ২২ মার্চ উখিয়ার বালুখালীতে ভয়াবহ আগুনে শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়, ঘরছাড়া হন প্রায় ৪৫ হাজার শরণার্থী। ওই ঘটনা তদন্তে সরকারের গঠিত কমিটি তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিল। তবে ওই প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। 

ওই কমিটির প্রধান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াত বেনারকে বলেন, “আগুনের প্রকৃত কারণটা আসলে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। আমাদের দেশে সেই প্রযুক্তিও নেই।” 

গত জানুয়ারিতে টেকনাফের নয়াপাড়া নিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরের ৫৫২টি ঘর পুড়ে যাওয়ার পর অগ্নি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. মো. মাকসুদ হেলালীও বেনারকে বলেছিলেন, “বাংলাদেশে ইচ্ছেকৃতভাবে লাগানো আগুন চিহ্নিত করার মতো কোনো প্রযুক্তি নেই।” 

শরণার্থী শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে “মানুষের মুখের কথার উপরই বিশ্বাস করতে হয়,” বলে বেনারকে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ।

“অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিড়ি-সিগারেট বা গ্যাসের চুলা থেকে আগুন লাগার কথা জানায় তারা,” বলেন তিনি। 

তবে সম্প্রতি একাধিক অগ্নিকাণ্ড পরিকল্পিত নাশকতা ছিল বলে অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। 

কিছু অগ্নিকাণ্ড ‘পরিকল্পিত’

অগ্নিকাণ্ড আতঙ্কে রোহিঙ্গাদের অনেকে এখন রাত জেগে শিবিরগুলোতে পাহারা দিচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন।

“সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবিরে যেসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে সেগুলো রহস্যজনক মনে হচ্ছে। এর পেছনে কোনো চক্রের হাত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে,” বেনারকে বলেন রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ। 

নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ড থেকে ঘরবাড়ি রক্ষায় শরণার্থীরা পাহারা দিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “সব সময়ই আগুন লাগার ভীতির মধ্যে রয়েছে লোকজন। তাই নিজেরাই পালা করে ক্যাম্পের প্রতি ব্লকে ব্লকে রাতের বেলা প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছি।” 

এদিকে নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সম্প্রতি এক নারীসহ তিন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)।

এদের মধ্যে রকিমা খাতুন নামের রোহিঙ্গা নারীকে গত ৩০ মার্চ রাতে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দার বাড়িতে আগুন দেওয়ার সময় “কেরোসিনসহ আটক করা হয়,” বলে বেনারকে জানান এপিবিএন- ১৬ অধিনায়ক মো. তারিকুল ইসলাম।

এছাড়া বালুখালীতে ১২ এপ্রিলের অগ্নিকাণ্ড এবং ওই সময় ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বেনারকে জানান উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গাজী সালাহ উদ্দিন। 

বেড়েছে অগ্নিকাণ্ড 

চলতি বছরের সাড়ে তিন মাসে শরণার্থী শিবিরগুলোয় যতগুলো আগুন লেগেছে তা গত বছরের চেয়ে বেশি বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন।

কক্সবাজারে শরণার্থীদের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রীয় সমন্বয় সংস্থা ইন্টার সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) বরাত দিয়ে ১৫ এপ্রিল এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। 

আইএসসিজি বলেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৮৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ২০২০ সালে ঘটেছিল ৮২টি আগুনের ঘটনা। যদিও এসব তথ্যের সাথে দ্বিমত করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উখিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক এবং টেকনাফ স্টেশনের মুকুল কুমার নাথের দাবি, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত টেকনাফ ও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে মোট ৩৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। 

সম্প্রতি শিবিরগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তারা বলেন, ২২ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল, এই ২২ দিনে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ১১টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতি দুই দিনে একটি করে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।

তবে সেভ দ্য চিলড্রেনের দাবি, ওই সময়ে ঘটেছে ৪৫টি অগ্নিকাণ্ড। 

আরআরআরসি শাহ রেজওয়ান হায়াতের মতে, “ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া সংখ্যাই সঠিক। কারণ প্রতিটি ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের যেতে হয়, এ জন্য তাঁদের কাছে সঠিক পরিসংখ্যান থাকে।” 

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীরের মতে, “আগুনের সংখ্যা যাই হোক না কেন, তা বেড়েছে, এটা স্পষ্ট।” 

আন্তর্জাতিক সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় ছাড়া এসব আগুনের “প্রকৃত কারণ বের করা সম্ভব হবে না,” মন্তব্য করে তিনি বেনারকে বলেন, “সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে কোন অগ্নিকাণ্ডটি দুর্ঘটনা আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা বের করা দরকার।” 

ড. মাকসুদ হেলালীর মতে “পরিস্থিতি দেখে এটা সহজে বোঝাই যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর জন্য একটি সংগঠিত চক্র কাজ করছে। তবে এরা কারা তা যথাযথ তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না।” 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের এই অধ্যাপকের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরে প্রচুর দাহ্য বস্তু থাকায় শত্রুতাবশত “একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়েও অনেক বড়ো ক্ষতি করা যায়।” 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা আগুন লাগাচ্ছে তাঁদের উদ্দেশ্য চিহ্নিত না করা গেলে এটা ঠেকানো যাবে না বলেও মনে করেন তিনি। 

এদিকে শরণার্থী শিবিরগুলোতে অগ্নিকাণ্ড রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে বেনারকে জানান আরআরআরসি। 

বালুখালীর আগুনে পোড়া শিবিরগুলোতে নতুন ঘর তৈরির ক্ষেত্রে “ঘরগুলো ফাঁকা ফাঁকা করে তৈরি করার পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপক সামগ্রী রাখা এবং ফায়ারের কর্মীরা যাতে সহজে ঢুকতে পারে সেই ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে,” জানান তিনি।

তিনি বলেন, “কিছু রাস্তার মোড় চওড়া করছি, যাতে ফায়ার সার্ভিসের বড়ো গাড়িগুলোও ঢুকতে পারে।”

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন