‘কারাদ্বীপ’ ভাসানচরে যেতে রোহিঙ্গাদের চাপ দেয়ার অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থার

আহম্মদ ফয়েজ
ঢাকা
2021-06-07
Share
‘কারাদ্বীপ’ ভাসানচরে যেতে রোহিঙ্গাদের চাপ দেয়ার অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থার কক্সবাজার উখিয়ার কুতুপালংয়ে একটি শিবিরে নিজের ঘরের সামনে সন্তানদের নিয়ে বসে আছেন এক রোহিঙ্গা। ১ জুন ২০২১।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরকে ‘সাগরের মাঝখানে একটি কারাদ্বীপ’ হিসেবে সোমবার আখ্যায়িত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ–এইচআরডাব্লিউ, যা গত সপ্তায় দ্বীপটি সম্পর্কে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের সাথে অনেকাংশে সাংঘর্ষিক।

পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই প্রায় ২০ হাজার শরণার্থীকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে জানিয়ে সোমবার প্রকাশিত রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এইচআরডাব্লিউ প্রতিবেদনে জানানো হয়, কক্সবাজার থেকে আরো রোহিঙ্গাকে সেখানে পাঠাতে ‘চাপ প্রয়োগ করছে’ বাংলাদেশ সরকার।

আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য দুর্যোগের কথা মাথায় নিয়ে জাতিসংঘ ও দাতা দেশগুলোর অবশ্যই ভাসানচরের সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলেও জানানো হয় প্রতিবেদনে।

“বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ অনেক শরণার্থীকে পুরোপুরি অবহিত না করে বা সম্মতি ছাড়াই দ্বীপে স্থানান্তর করে এবং স্থানান্তরিতদের মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসতে বাধা দেয়,” বলা হয় ওই প্রতিবেদনে।

তবে ভাসানচরে শরণার্থীদের “পূর্ণ সম্মতির ভিত্তিতেই” স্থানান্তর করা হয়েছে জানিয়ে এইচআরডাব্লিউ’র প্রতিবেদনের অভিযোগ অস্বীকার করে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াত বেনারকে বলেন, “এখানে জোরপূর্বক স্থানান্তরের কোনও ঘটনা ঘটেনি।”

এদিকে এইচআরডাব্লিউ’র এই প্রতিবেদনের সাথে ভাসানচর সম্পর্কে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের মতামতের ভিন্নতা রয়েছে।

ঠিক এক সপ্তাহ আগে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভাসানচরে শরণার্থী স্থানান্তরে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছিলেন, দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি করতে হবে।

ওই দ্বীপ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে দুই কর্মকর্তা জানান, কক্সবাজারের শিবিরগুলোর তুলনায় রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য ভাসানচর অনেক ভালো।

পাশাপাশি ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সহায়তা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তাঁরা বলেছিলেন, এই দ্বীপে মর্যাদার সাথে রোহিঙ্গাদের বসবাস নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশকে সহায়তা করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বেনারকে বলেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার উচিত মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা।

তাঁর মতে, বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পৃথিবীর বহু দেশের কাছে মডেল। আর তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা কম।

“কিছু দিন আগে জাতিসংঘের প্রতিনিধি দল ভাসানচর পরিদর্শন শেষে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। আমার ধারণা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সেই তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছে,” বলেন ড. ইমতিয়াজ।

কেউ ফিরে আসতে চাইলে ‘যেন সুযোগ দেওয়া হয়’

ভাসানচরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই মর্মে এইচআরডাব্লিউ’র অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় আরআরআরসি বলেন, “ভাসানচরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কক্সবাজারের তুলনায় কমপক্ষে ৫০ গুণ উন্নত। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে কক্সবাজারে অনেক ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, কিন্তু সেই বিবেচনায় ভাসানচর খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে।”

প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ২০২০ সালের মে থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ভাসানচর ও কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরের ১৬৭জন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরডাব্লিউ।

“দ্বীপের শরণার্থীরা অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ, চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ, খাদ্য সংকট, জীবিকার অভাব এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন,” বলা হয় প্রতিবেদনে।

“প্রত্যন্ত দ্বীপে মানুষকে নিতে বাধ্য করায় নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে,” মন্তব্য করে সংগঠনটির শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকার বিষয়ক পরিচালক বিল ফ্রেলিক বলেন, “দাতাদের উচিত রোহিঙ্গাদের সহায়তা করা, তবে এটাও জোর দেয়া উচিত যে, শরণার্থীদের যারা মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসতে চায় তাদের যেন সেই সুযোগ দেওয়া হয়।”

রোহিঙ্গা পরিস্থিতির মূল দায়িত্ব মিয়ানমারের ওপর বর্তায়—এ কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনমূলক ঘটনার অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাঁদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে অস্বীকার করেছে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের মে মাসে, বাংলাদেশ সমুদ্রপথে উদ্ধারকৃত তিনশ’র বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভাসানচরে নিয়ে যায়। সরকার প্রাথমিকভাবে বলেছিল, কোভিড পরিস্থিতির কারণে তাঁদের ওই দ্বীপে কোয়ারাইন্টাইনে রাখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের পরিবারের সাক্ষাত পায়নি।

গত ১৭ থেকে ২০ মার্চ জাতিসংঘের ১৮ সদস্যের একটি দল দ্বীপটি পরিদর্শনের পর, কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘকে মানবিক সহায়তা প্রদান শুরু করার জন্য চাপ দিচ্ছে বলে এইচআরডাব্লিউ উল্লেখ করেছে।

“শরণার্থীরা বলছে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের সফরের সময় তাঁদের কেবল সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কথা বলতে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁদের বাধ্য করা হয়েছিল এমনভাবে কথা বলতে যেন দ্বীপে কোনো সমস্যা হচ্ছে না,” প্রতিবেদনে বলা হয়।

গত ৩১ মে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ভাসানচরে কয়েকশ' শরণার্থী বিক্ষোভ করার কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, তাঁরা ওই দ্বীপ থেকে ফেরার দাবি জানিয়েছে।

এদিকে সরকার ভাসানচরে জীবিকার জন্য নানা ধরনের সুযোগ–সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান আরআরআরসি।

“সেখানে চিকিৎসা সেবা প্রতিদিনই একটু একটু করে উন্নতি হচ্ছে,” বলেন তিনি।

আয়রোজগারের সুযোগ নেই

ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী জন্নাত আরা বেনারকে বলেন, এখানে একদম ভালো লাগছে না। খাবার নিয়ে কিছুটা কষ্ট আছে। কিন্তু আয়–রোজগারের সুযোগ নেই।

“কক্সবাজারে থাকতে দিন মজুরের কাজ করার সুযোগ ছিল। কিছু টাকা আয় হলে সেগুলো দিয়ে মাছ–মাংস কিনে খেতে পারতাম। কিন্তু এখানে তা পারছি না,” বলেন জন্নাত।

জন্নাতের স্বামী মো. হাসান বেনারকে বলেন, প্রথম দিকে লোকজন সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারত, কিন্তু চর থেকে রোহিঙ্গা পালিয়ে যাওয়ার পর সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা আরাকান ন্যাশনাল ইউনিয়নের সেক্রেটারি মাস্টার মো. ইলিয়াছ বেনারকে বলেন, “প্রথমে তারা বলেছিল ভাসানচর যাব, এখন বলছে চলে আসব। আমাদের কথা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের জীবনের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সব সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করে সেখানেই রাখা হোক।”

এদিকে এক লাখ শরণার্থীর জন্য প্রস্তুত ভাসানচরে বাকি ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা জানিয়ে সেখানে শরণার্থীদের আবাসনসহ সকল চাহিদা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগী হওয়ার জন্য রোববার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বিভিন্ন দাতা দেশে ও সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস এই আহ্বান জানান বলে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব কে এম সাখাওয়াত মুন।

তিনি বলেন, ভাসানচরের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাসের উপযোগী ব্যবস্থাসহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে বলেও বৈঠকে জানান কায়কাউস।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে সুনীল বড়ুয়া।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন