মানবাধিকার প্রতিবেদন: রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রকে গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমার জান্তা

2022.06.08
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
মানবাধিকার প্রতিবেদন: রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রকে গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমার জান্তা রাখাইনে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হত্যার শিকার ছেলের পরিচয়পত্র দেখাচ্ছেন কক্সবাজার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত একজন রোহিঙ্গা।
[এপি ফাইল ফটো]

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদেরকে দেয়া পরিচয়পত্র তাঁদের ওপর গণহত্যা চালানোর কাজে ব্যবহার করছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদি গণহত্যা এবং রুয়ান্ডার গণহত্যার মিল রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটস।

সংস্থাটি এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ন্যস্ত করার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

ফরটিফাই রাইটস গত মঙ্গলবার ‘জেনোসাইড বাই অ্যাট্রিশন: দ্য রোল অফ আইডেন্টিটি ডকুমেন্টস ইন দ্য হোলোকাস্ট অ্যান্ড দ্য জেনোসাইডস অফ রুয়ান্ডা অ্যান্ড মিয়ানমার’ শীর্ষক ৬৩ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

সামরিক জান্তা কীভাবে জাতীয় যাচাইকরণ কার্ড (এনভিসি) গ্রহণে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে তার বিশদ বিবরণ রয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদকরা বলেছেন, এই কার্ড দিয়ে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব এবং সুরক্ষার অধিকার হরণ করা হয়।

কর্তৃত্ববাদী শাসকরা কীভাবে ইহুদি গণহত্যা এবং রুয়ান্ডার গণহত্যায় একই ধরনের শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল তার একটি তুলনামূলক চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

রিপোর্টের সহ-লেখক ফরটিফাই রাইটসের সিনিয়র উপদেষ্টা এবং ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্র্যাসলার সেন্টার ফর হোলোকাস্ট অ্যান্ড জেনোসাইড স্টাডিজের অধ্যাপক কেন ম্যাকলিন রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে বলেছেন, “অপরাধীরা গণহত্যা সম্পাদনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে শনাক্তকরণ কার্ড ব্যবহার করেছে।”

“রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্নকরণে মিয়ানমারের জান্তাদের চলমান কার্যক্রমের সাথে ইহুদি গণনিধন এবং রুয়ান্ডার গণহত্যার তথ্য প্রমাণগুলোর উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়,” বলেন তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী হলোকাস্ট এবং রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় ব্যবহৃত শনাক্তকরণ কার্ডগুলো ধীরস্থির প্রক্রিয়ায় নির্মূল করার মাধ্যমে গণহত্যা কাজে ভূমিকা রেখেছিল, যেটিকে “একটি সুরক্ষিত গোষ্ঠীকে টেকসই পরোক্ষ পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে শক্তি হ্রাসের মাধ্যমে ধ্বংস” করা হিসেবে একে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

এই ধরনের নীতি দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে ব্যবহার করা হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের চলমান গণহত্যায় ভূমিকা রেখে চলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

রোহিঙ্গা-গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ২০ জনেরও বেশি ব্যক্তির সাক্ষাৎকার, সামরিক সরকারের ফাঁস হওয়া নথি এবং ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত সামরিক ক্যু’র পর থেকে জান্তা-সমর্থিত মিডিয়াগুলোর পর্যালোচনার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

কীভাবে সামরিক জান্তা তাঁদেরকে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় ব্যতীত এনভিসি বহন করতে বাধ্য করে, তাঁদের চলাচল সীমিত করে, জীবিকা অর্জনের ক্ষমতা হ্রাস করে এবং “তাঁদের ধ্বংস হওয়ার জন্য পরিকল্পিত জীবন পরিস্থিতি তৈরি করে,” রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা তা বর্ণনা করেছেন।

মিয়ানমারের নাগরিকত্ব এবং জাতিগত পরিচয় থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্তের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা ‘বাঙালি’ অভিবাসী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ কার্যালয়ের অনুসন্ধানের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পরিচয়ের বর্ধিত রাজনীতিকরণ এবং সংরক্ষিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপসমূহ “নৃশংস অপরাধ সংঘটনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির সূচক।” ইহুদি ও তুতসি জনগোষ্ঠীকে নিধনের জন্য একই ধরণের আইনগত ও প্রশাসনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, যা এখন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফরটিফাই রাইটসের সিনিয়র মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক জন কুইনলি বলেছেন, “সামরিক জান্তার অধীনে রোহিঙ্গারা অস্তিত্বের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি একটি অবৈধ শাসন যা সুদূরপ্রসারী নৃশংসতার জন্য দায়ী।”

“রোহিঙ্গা জাতিসত্তা এবং নাগরিকত্ব অব্যাহতভাবে অস্বীকার করা গণহত্যার সূচক। [ছায়া] জাতীয় ঐক্য সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে জান্তা এখনও রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বের রেকর্ড মুছে দিতে তাঁদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হতে বাধ্য করার জন্য জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছে।”

rohingya pic2.jpg
বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে রাখাইন রাজ্যের মংডুর তংপিওলেটই শহরের প্রত্যাবাসন শিবিরে রোহিঙ্গা নারীদের কাছে শনাক্তকরণ কার্ড হস্তান্তর করেছেন মিয়ানমারের অভিবাসন কর্মকর্তারা। [এপি ফাইল ফটো]

জান্তার জবাবদিহি করা

ফরটিফাই রাইটস বলেছে শনাক্তকরণ কার্ড এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের মধ্যে সংযোগ স্বীকৃত হলেও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা, কিছু দূতাবাস এবং মিয়ানমারের অন্যরা রোহিঙ্গাদের এনভিসি ব্যবহারে বাধ্য করার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বরং কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ‘রাষ্ট্রহীনতার’ সমাধান হিসেবে শনাক্তকরণ কার্ডের ব্যবহার সমর্থন করেছে।

ফরটিফাই রাইটস বলেছে, এনভিসি প্রক্রিয়া এবং গণহত্যামূলক কার্যক্রমের মধ্যে সম্পর্ক আছে এবং তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর সমাধানে মনোযোগী হওয়া উচিত।

মানবাধিকার সংস্থাটি মিয়ানমারের জান্তাকে অস্ত্র, অর্থ ও রাজনৈতিক বৈধতার সুযোগ থেকে বিরত রাখার জন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

‘মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অনস্বীকার্য হুমকিস্বরূপ,’ ফরটিফাইয়ের কুইনলি বলেছেন।

‘ইউ.এন. সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জেগে উঠতে হবে এবং এখনই কাজ করতে হবে। জান্তাদের আকাঙ্ক্ষিত সম্পদ আকাঙ্ক্ষাকে নাকচ করতে এবং গণহত্যাসহ তাঁদের সমস্ত অপরাধের জন্য দায়বদ্ধ করতে হবে,” বলেন তিনি।

২০১৬ সালে সামরিক দমনাভিযানের মাধ্যমে প্রায় ৯০ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল মিয়ানমার। বিদ্রোহীদের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ২০১৭ সালে তার চেয়ে বড়ো গণবিতাড়নের ঘটনা ঘটায় মিয়ানমার সেনারা। জাতিগত সংখ্যালঘুর হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে তারা হত্যা করে এবং সাত লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র এবং রোহিঙ্গাদের সাথে বিস্তৃত সাক্ষাত্কারের উপর ভিত্তি করে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন এবং গণধর্ষণ সহ ভয়াবহ অভিযান সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে গাম্বিয়া। বর্তমানে ওই আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি বিচার করার এখতিয়ার আছে কিনা তা নির্ধারণের জন্য আদালত শুনানি চলছে।

 প্রতিবেদনটি বেনারনিউজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিও ফ্রি এশিয়ার জসুয়া লিপস তৈরি করেছেন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।