মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে রোহিঙ্গা শিশু আহত

জেসমিন পাপড়ি ও আবদুর রহমান
2018.06.28
ঢাকা ও কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
180628_Rohingya_boy_1000.jpg বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শুন্যরেখায় আশ্রয় নেওয়া এক রোহিঙ্গা নারী শিশু সন্তান নিয়ে ছড়া পার হয়ে আসছেন। ১৬ মার্চ ২০১৮।
আবদুর রহমান/বেনারনিউজ

শূন্য রেখার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া এক রোহিঙ্গা শিশুকে গুলি করেছে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপি।

বৃহস্পতিবার বিকাল পৌনে ৫টার দিকে উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু এলাকার কোনারপাড়া শূন্যরেখায় রোহিঙ্গাদের উপর গুলি বর্ষণের এ ঘটনা ঘটে বলে বেনারকে জানান ঘুমধুম পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক ইমন চৌধুরী।

গুলিবিদ্ধ আনসার উল্লাহ (১২) কোনারপাড়ার শূন্যরেখা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা জমির হোসেনের ছেলে। আট মাস আগে মিয়ানমারের রাঙ্গাবালী এলাকা থেকে এসে তারা শূন্য রেখায় আশ্রয় নেন বলে জানান আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা (মাঝি) আরিফ উল্লাহ।

তিনি বলেন, শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরের পেছনে মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে বেশ কয়েকজন শিশু খেলাধুলা করছিল। এ সময় বিজিপি গুলি চালায়। পরে স্থানীয় রোহিঙ্গারা আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে।

তবে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খান বেনারকে বলেন, “আহত শিশুটি কাঁটাতারের বেড়ার কাছে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। সম্ভবত এ কারণে গুলি করেছে বিজিপি।”

“গুলি করার কারণ জানতে চেয়ে বিজিপির কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে,” বলেন তিনি।

ইমন চৌধুরী জানান, বাম পায়ের ঊরুতে গুলিবিদ্ধ আনসার উল্লাহ এখন উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন রেড ক্রিসেন্ট ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারে বিজিবির রিজিওয়ন সদর দপ্তরে বিজিপি-বিজিবি পতাকা বৈঠকে শূন্য রেখার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেয় বিজিপি। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা বৈঠক শেষ হওয়ার পর পরই কোনারপাড়া সীমান্তে এ ঘটনা ঘটল।

প্রসঙ্গত, গত বছর ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হলে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে এসে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নেয় ১ হাজার ২৩ পরিবারের প্রায় ৯ হাজার রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের বাহিনীর হুমকি-ধমকির পর এখন ওই আশ্রয়শিবিরে প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

শূন্যরেখায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, “বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ করে মিয়ানমার বিজিপির একটি দল এসে রোহিঙ্গাদের ওপর গুলি চালায়। এতে এক রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় বাকিরা ভয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। এখানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।”

শূন্য রেখার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস মিয়ানমারের

বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের বিজিবির আঞ্চলিক সদর দপ্তরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এর আঞ্চলিক কমান্ডার পর্যায়ে সৌজন্যমূলক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে ৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি কক্সবাজার আঞ্চলিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিবুল্লাহ। মিয়ানমারের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মংডু জেলার বিজিপি ১ নম্বর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পুলিশ মায়েন্ট টু।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু কোনারপাড়া শূন্য রেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন কক্সবাজার আঞ্চলিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিবুল্লাহ।

তবে তারা কোনো দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করেনি বলে জানান তিনি। প্রেস ব্রিফিংয়ে বিজিপির কমান্ডার মায়েন্ট উপস্থিত থাকলেও কোনো কথা বলেননি।

এদিকে বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে বলা হয়, এখন বাংলাদেশে ইয়াবাসহ মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার হচ্ছে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের নাগরিকও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ইয়াবাসহ ধরা পড়ছে।

আশ্বাসের পরেও নাইক্ষ্যংছড়ির শূন্য রেখার আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের তেমন সাড়া মিলছে না বলেও বৈঠকে অভিযোগ করা হয়।

এর জবাবে বিজিপির কমান্ডার মায়েন্ট টু জানান, ইয়াবা চোরাচালান ঠেকাতে মিয়ানমারেও অভিযান চালানো হচ্ছে। সেখানেও ইয়াবাসহ লোকজন ধরা পড়ছে। সেখানকার কিছু সন্ত্রাসী ও চোরাচালানি বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নিচ্ছে।

মিয়ানমারের বহু পলাতক আসামি বাংলাদেশে লুকিয়ে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের গ্রেপ্তার করা হলে মাদক চোরাচালান কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে সীমান্তে বিজিবি ও বিজিপির যৌথ টহল প্রয়োজন।

জবাবে বিজিবির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিবুল্লাহ বাংলাদেশে মিয়ানমারের কোনো চোরাচালানি কিংবা সন্ত্রাসীর ঠাঁই নেই বলে জানান। তারপরও সুনির্দিষ্টভাবে তালিকা দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রেস ব্রিফিংয়ে এস এম রাকিবুল্লাহ আরও বলেন, বৈঠকে সীমান্তে ইয়াবাসহ চোরাচালান দমন, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে দুই দেশ সম্মত হয়। এ কারণে সীমান্তে নিয়োজিত দু'দেশে সীমান্তরক্ষীদের চলমান যৌথ টহল আরও জোরদার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

দুই মাস পর পর এই বৈঠক হওয়ার কথা উল্লেখ করে এসএম রাকিবুল্লাহ আরও বলেন, কোনারপাড়ায় জিরো পয়েন্টে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে কোনো ধরনের মাইকিং ও সীমান্তে সেনা মোতায়েনের বিষয়েও তাদের সতর্ক করা হয়েছে। এই বিষয়টি তারা গুরুত্ব সহকারে দেখার আশ্বাস দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।