রোহিঙ্গা গণহত্যার শুনানি প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় এ মাসেই

বিশেষ প্রতিবেদন
2022.07.12
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
রোহিঙ্গা গণহত্যার শুনানি প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় এ মাসেই নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানি। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
[ছবি: মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়]

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) আগামী ২২ জুলাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়েরকৃত গণহত্যা মামলায় দেশটির আপত্তির বিষয়ে রায় দেবে বলে জানিয়েছে।

গত সোমবার এক বিবৃতিতে আইসিজে জানায়, ২২ জুলাই বিকেল ৩টায় নেদারল্যান্ডসের হেগে পিস প্যালেসে আদালত বসবে। সে সময় আদালতের সভাপতি বিচারক জোয়ান ই ডনোগু আইসিজে’র সিদ্ধান্ত পাঠ করবেন।

সামরিক বাহিনীর দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া উত্তর রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এলাকার এক রোহিঙ্গা বেনারনিউজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিও ফ্রি এশিয়াকে (আরএফএ), অপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, “২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যার প্রমাণ রয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেই তা বোঝা যায়। বুথিডং এবং মংডু গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার ভয়ে সেখানকার বাসিন্দারা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে।”

“তারা (মিয়ানমার) যতই অস্বীকার করুক না কেন, আমাদের লোকদের ভোগান্তি আমরা জানি। তাই আমরা তাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা চাই,” বলেন তিনি।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) পশ্চিম আফ্রিকার ওই দেশটিকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তাব দেওয়ার পর গাম্বিয়ার সংসদ ২০১৯ সালের জুলাই মাসে পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে। নভেম্বরে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে ওআইসি থেকে তহবিল পেয়েছে বলে জানিয়েছে গাম্বিয়া।

প্রাথমিক শুনানিতে গাম্বিয়া বলেছে “২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের সেনা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক এবং পদ্ধতিগত 'নির্মূল অভিযান’ শুরু করে। এই অভিযানের সময় সংঘটিত গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের একটি গোষ্ঠী হিসাবে সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা।”

এর উদ্দেশ্যে মিয়ানমার সেনা ও অন্যান্য বাহিনী “গণহত্যা, ধর্ষণ, ও অন্যান্য যৌন নিপীড়নকে ব্যবহার করে। সেই সাথে বাসিন্দাদের অনেককে ঘরের ভিতরে তালাবদ্ধ রেখে তাদের গ্রামগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এ ধরনের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড আরও ব্যাপক এবং বিস্তৃত করা হয়,” বলে অভিযোগ করে গাম্বিয়া।

মিয়ানমার সামরিক পরিষদের প্রতিনিধি এ বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি শুনানিতে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, আইসিজে’র মামলাটি শুনানির অধিকার নেই।

সামরিক পরিষদের নিয়োগকৃত আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টেকার যুক্তি দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার করার অনুমতি দেওয়া উচিত নয় এবং আদালতের এই মামলা শুনানির এখতিয়ার নেই।

এ বিষয়ে মতামত জানার জন্য মঙ্গলবার ফোন করা হলে সামরিক পরিষদের মুখপাত্র আরএফএ’র ফোন রিসিভ করেননি। কিছু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে, সামরিক পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক মন্ত্রী কো কো হ্লাইং-এর নেতৃত্বে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল আইসিজে’র রায় শোনার জন্য হেগে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার হবে

আইসিজে জানিয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে শুনানির সময় পিস প্যালেস জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না। শুধুমাত্র আদালতের সদস্য ও মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিদের গ্রেট হল অফ জাস্টিসে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

কূটনীতিকবৃন্দ এবং জনসাধারণ আদালতের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি জাতিসংঘের ওয়েব টিভিতে একটি লাইভ ওয়েবকাস্টে মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম দেখতে পারবেন বলে জানায় আইসিজে।

গাম্বিয়া রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, গণহত্যার জন্য দায়ীদের শাস্তি, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধের পুনরাবৃত্তি না করার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আইসিজে জাতিসংঘের প্রধান বিচার বিভাগীয় অঙ্গ। ১৯৪৫ সালে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই আদালতের রায় রাষ্ট্রসমূহের জন্য বাধ্যতামূলক এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার নেই।

যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এই বছরের মার্চে বলেছিলেন, “২০১৭ সালে প্রধানত মুসলিম রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে বার্মার সামরিক বাহিনী গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে।”

ওই বছর পশ্চিম মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ করে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে উৎখাত করে। সহিংস অভিযানের মাধ্যমে ৭ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি লোককে প্রতিবেশী বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমতা দখল করা সামরিক জান্তা এখনো রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের শেষ নাগাদ ১ লাখ ৪৪ হাজার রোহিঙ্গাকে উৎখাত করে রাখাইনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে রাখা হয়েছে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গারাও দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সামরিক জান্তা বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।