প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিলেন জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান

সুনীল বড়ুয়া ও আবদুর রহমান
2022.08.16
কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিলেন জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান কক্সবাজার উখিয়ার কুতুপালং শিবির পরিদর্শন করছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট। ১৬ আগস্ট ২০২২।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

মিয়ানমারের রাখাইনে এখনো ফেরার পরিস্থিতি হয়নি জানিয়ে প্রত্যাবাসনের জন্য কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের আরো অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট।

বাংলাদেশ সফরের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা নারী, ধর্মীয় নেতা ও তরুণদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন মিশেল। এটাই তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর।

এসব বৈঠকে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের কয়েকজন বেনারকে জানান, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার শিবিরের নিরাপত্তা, শিশুদের শিক্ষার উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও মানবাধিকারসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন।

তবে কক্সবাজার সফরের সময় গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কোনো কথা বলেননি মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার।

পাশে থাকার আশ্বাস জাতিসংঘের

উখিয়ার ৪ নম্বর শরণার্থী শিবিরের নারী বান্ধব কেন্দ্রে নয় জন রোহিঙ্গা নারী প্রতিনিধির সঙ্গে মত বিনিময় করেন মিশেল ব্যাশেলেট। সেখানে উপস্থিত থাকা রোহিঙ্গা নারী আমেনা খাতুন বেনারকে বলেন, “হাইকমিশনার জানতে চান কেন এখানে পালিয়ে এসেছি। জবাবে বলেছি, সেদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণে বাঁচতে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই, তবে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেলে।”

বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক রোহিঙ্গা নারী কামরুন নেছা (৫০) বেনারকে বলেন, “আমি হাইকমিশনারকে বলেছি, মিয়ানমার সেনাদের অত্যাচারে এ পর্যন্ত পাঁচবার পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে কিন্তু আমরা এখানে জেলখানার মতো বসবাস করছি। আমরা নিজ দেশে চলে যেতে চাই। কিন্তু রাখাইনে শান্তি ফিরলেই কেবল আমরা সেখানে ফিরব।”

“২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো অত্যাচারের ক্ষতিপূরণও দাবি করেছি আমরা,” বলেন তিনি।

“জবাবে মিশেল ব্যাশেলেট বলেছেন, রাখাইনের পরিস্থিতি এখনো ভালো নয়। তাই যত দিন পর্যন্ত রাখাইনের পরিস্থিতি অনুকূল হবে না, ততদিন আমাদের সেখানে পাঠানো ঠিক হবে না। আমাদের ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘ সহায়তা করার বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। তবে তিনি আমাদের যে অপেক্ষা করতে হবে সেটা বলেছেন,” বলেন কামরুন নেছা।

গুল নাহার নামে আরেকজন নারী বেনারকে বলেন, “আমাদের ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘ সব ধরনের সহায়তা করবে বলে তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই সমস্যা সমাধানে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে সেটাও জানিয়েছেন তিনি।”

রোহিঙ্গাদের অধিকার ও সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি উল্লেখ করে ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ নামে রোহিঙ্গাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে মিশেল ব্যাশেলেটের একটি চিঠি দিয়েছেন বলে বেনারকে জানান রোহিঙ্গা নারী নেত্রী জামালিদা বেগম।

উখিয়ার চার নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গা ধর্মীয় নেতা মাওলানা মো. জামিল (৪৭) বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর কথা শোনা যাচ্ছে—জানিয়ে তাঁকে বলেছি, প্রত্যাবাসনের কথা বললেই সেখানে (মিয়ানমারে) অশান্তি শুরু হয়ে যায়, লড়াই শুরু হয়। এই অবস্থায় আমরা কীভাবে সেখানে যাব?”

“কী করলে আমরা যেতে পারব, কীভাবে আমাদের অধিকার ফিরে পাব— এসব বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছি। তবে তিনি সব কিছুর জন্য আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলেন,” জানান জামিল।

শিক্ষার দাবি রোহিঙ্গাদের

মিশেল ব্যাশেলেটের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানকালে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বলে বেনারকে জানান মাওলানা জামিল।

এ প্রসঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া হাফেজ খুরশিদ বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো হতে পারে। কারণ, ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী রোহিঙ্গাদের কোনো কাজ নেই। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থাও নেই। আমরা রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছি।”

রোহিঙ্গা ইয়ুথ দলের আবদুল আজিজ বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমারে কারিকুলাম চালু না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। অনেক কিশোর-কিশোরী বেকার জীবন কাটছে। ফলে যাতে ক্যাম্পে মিয়ানমারের শিক্ষাক্রম চালু হয় সেই অনুরোধ করি।”

“এ ছাড়া তিনি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিব উল্লাহ বিষয়ে জানতে চান। আমরা বলেছি তিনি (মুহিব উল্লাহ) না থাকায় রোহিঙ্গাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ভালোমন্দ ব্যাপারে তেমন আর কেউ চিন্তা করছে না।”

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান রোহিঙ্গাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার পর কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ে বৈঠক করেন বলে বেনারকে জানান আরআরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াত। ওই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও ছিলেন বলে জানান তিনি।

“হাইকমিশনার রোহিঙ্গা শিবিরের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন। আমরা তাকে সব বিষয়ে বলেছি,” বলেন শাহ রেজওয়ান হায়াত।

মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ

সোমবার বিকেলে কক্সবাজার যাওয়ার আগে ঢাকায় দেশের মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মিশেল ব্যাশেলেট। এ সময় দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, গুম, বাকস্বাধীনতা, আসন্ন নির্বাচন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিক গ্রেপ্তার, মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও নারী নির্যাতন নিয়ে নানা উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন তাঁরা।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর বেনারকে বলেন, “আমরা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ভালো ও মন্দ দুটি দিকই তুলে ধরেছি। গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, নির্বাচনসহ সবকিছু নিয়েই সেখানে কথা হয়।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছি। জবাবে তিনি বলেছেন, আমার কাছে কোনো মিরাকেল নেই। আমরা একটা প্রসেস ওরিয়েন্টেড ডিসকাশনে যেতে পারি।”

তিনি বলেন, “একটা নির্বাচন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে না। সিস্টেম ঠিক না থাকলে নির্বাচন হলেও মানুষ গণতন্ত্র পাবে না। এই বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা হবে। ডায়লগের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানান জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার।”

চার দিনের সফরে রোববার ঢাকায় আসেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট। সেদিন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করেন।

সফরের শেষ দিন বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছাড়াও বিকেলে ঢাকায় আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে তাঁর।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।