পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্যাপক সস্ত্রাসের অভিযোগ

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2018-05-14
Share
পঞ্চায়েত নির্বাচনে উত্তর ২৪ পরগনার বিলকান্দায় ছুরিকাঘাতে আহত এক রাজনৈতিক দলের এজেন্ট। ১৪ মে ২০১৮। পঞ্চায়েত নির্বাচনে উত্তর ২৪ পরগনার বিলকান্দায় ছুরিকাঘাতে আহত এক রাজনৈতিক দলের এজেন্ট। ১৪ মে ২০১৮।
বেনারনিউজ

সোমবার পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদলগুলো ব্যাপক সন্ত্রাস ও রক্তপাতের অভিযোগ করলেও নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হয়েছে বলে দাবি করেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস।

নির্বাচনের দিন সহিংসতায় বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমসূত্র জানালেও সরকার বা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি।

‘কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে’ বলে ওই দিন বিকেলে সাংবাদিকদের জানান পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজি সুরজিৎ করপুরকায়স্থ।

তৃণমূল কংগ্রেস দলের ৬ কর্মী নিহত হবার কথা জানিয়ে ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণ’ হয়েছে বলে দাবি করেন দলটির মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়।

“কিছু বুথে গোলমাল হয়েছে,” স্বীকার করে তিনি বলেন, “তবে প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে।”

বিরোধীরা পরিকল্পনামাফিক নির্বাচনকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে সোমবার সকাল থেকেই নির্বাচন কমিশনের অফিসে অভিযোগ আসতে শুরু করে বলে বেনারকে জানান নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক কমিশনের এক আধিকারিক। তবে সব জায়গাতেই পুলিশকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, শাসক দলের বাধাদান ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির কারণে বহু জায়গাতেই মানুষ ভোট দিতে পারেনি।

গণমাধ্যমে প্রচারিত খবর থেকে জানা যায়, অনেক জায়গাতেই সশস্ত্রভাবে ভোট বানচালের চেষ্টা হয়েছে। কোথাও ব্যালট পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বেনারকে বলেন, “নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা যে উদ্বেগ জানাচ্ছিলাম সেটাই নির্বাচনের দিন ধরা পড়ল।”

কমিউনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্কসবাদীর নেতা তন্ময় ভট্টাচার্য্য বেনারকে বলেন, “গোটা রাজ্যকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। মানুষ ভোটের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।”

পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করার দাবি তুলেছেন বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ বেনারকে বলেন, “ব্যাপক হিংসার মধ্য দিয়ে যেভাবে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালিত হলো তাতে রাজ্য সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেল।”

এর আগে গত ১৫দিনে প্রাক নির্বাচনী পর্বে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।

সোমবার সকাল ৭টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ২০টি জেলার ৬৬ শতাংশ আসনে ভোট নেওয়া হয়েছে। এই সময়ে ভোট পড়ে ৭২.৫ শতাংশ।

এদিন নির্বাচন হয় গ্রাম পঞ্চায়েতের ৩১৭৮৯টি, পঞ্চায়েত সমিতির ৬১১৯টি এবং জেলা পরিষদের ৬২১টি আসনে।

এবার ইলেকট্রনিক ভোট মেশিনের পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়া হয়েছে। তবে ৩৪ শতাংশ আসনে আগেই প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন।

ফের মামলা

গত এক মাস ধরে সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টে আধা ডজনের বেশি মামলার শুনানির পর সোমবার রাজ্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ব্যবস্থা করে।

আদালত জানায়, নির্বাচনে অপ্রীতিকর ঘটনা, বিশেষ করে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটলে তার দায় নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের।

এদিকে নির্বাচনে সহিংসতার প্রেক্ষিতে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জ্যোর্তিময় ভট্টাচার্য্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আইনজীবী সুপ্রতীক রায়।

আদালত মামলা করার অনুমতি দেবার পরই মামলা দায়ের করে দ্রুত শুনানির আর্জি জানাতে চলেছেন বলে তিনি বেনারকে জানান।

সাবেক ছিটমহলে ভোট বয়কট

সাবেক ছিটমহলবাসীদের অধিকাংশই পঞ্চায়েত নির্বাচন বয়কট করেছেন বলে দাবি করেছেন ‘আমরা ছিটমহলবাসী’ নামের সংগঠনের নেতারা।

মাথাভাঙ্গার কারকোয়াবাড়ি, জংড়া, ফালনাপুর, নলগ্রাম এবং দিনহাটার কচুয়া ও উত্তর বাঁশজানি প্রভৃতি সাবেক ছিটমহলের কয়েক হাজার বাসিন্দা তাঁদের ন্যায্য অধিকার না দেবার প্রতিবাদে ভোটে অংশ নেননি বলে জানান সংগঠনের নেতা বীজেন্দ্র নাথ বর্মন।

বীজেন্দ্র নাথ বেনারকে বলেন, “ছিটমহল বিনিময় চুক্তির পর তিন বছর কেটে গেলেও এখনও তাঁদের নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট, জমির পাট্টা দেওয়াসহ প্রকৃত উন্নয়নের কোনও কাজই করা হয় নি।”

তবে ভোট বয়কটের জন্য তাঁদের অনেককেই শাসক দলের শাসানি ও হুমকির মুখে পড়তে হয় বলে জানান তিনি।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ীদের ভাগ্য ঝুলন্ত

৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ীদের ভাগ্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ঝুলে রয়েছে। এই বিজয়ী প্রার্থীদের প্রায় সকলেই শাসক দলের।

রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এদের জয়ী হওয়ার সার্টিফিকেটও দেওয়া হয়েছে বলে কমিশন সুত্রে বলা হয়।

তবে সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের একটি মামলায় গত বৃহষ্পতিবার প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ আদালতের অনুমতি ছাড়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী আসনগুলির ফল ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারির ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

আইনজীবী শামিম আহমেদ বেনারকে বলেন, “রেকর্ড ৩৪ শতাংশ সংখ্যক প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের পরেই আদালত এটিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করে এই আসনগুলির ফল প্রকাশে স্থগিতাদেশ দেয়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, “কোন পরিস্থিতিতে এত আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় হলো তা খতিয়ে দেখেই আদালত পরবর্তী নির্দেশ দেবেন বলে মনে হয়।”

আগামী ৩ জুলাই এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে বলে আদালত সূত্রে বলা হয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন