ধর্ষিতাদের ‘টু ফিংগার’ টেস্ট নিষিদ্ধ

শরীফ খিয়াম
2018.04.12
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ধষর্ণ বিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ধষর্ণ বিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশ। ৫ এপ্রিল ২০১৮।
বেনারনিউজ

ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর শারীরিক পরীক্ষায় ‘টু ফিংগার টেস্ট’ ও ‘বায়ো ম্যানুয়াল টেস্ট’ নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত।

বৃহস্পতিবার এক রায়ে আদালত বলেছে, “টু ফিংগার টেস্ট অবৈজ্ঞানিক, অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয়।” একইসঙ্গে ‘বায়ো ম্যানুয়াল টেস্ট’-কে নারী স্বাস্থ্যের জন্য হানিকারক বলা হয়েছে।

“আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্ষিতাদের শারীরিক পরীক্ষায় এই দুটি ‘টেস্ট’ আর ব্যবহার করা যাবে না,” বেনারকে বলেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট শারমিন আক্তার।

পাঁচ বছর আগে এক রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি একেএম সহিদুল হক এই রায় দেন।

নারী উন্নয়ন কর্মী এবং শিক্ষাবিদ রোকেয়া কবির বেনারকে বলেন, “টেস্ট দুটি নিষিদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের নারী আন্দোলন কর্মীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হয়েছে। এতে আমরা অত্যন্ত খুশি।”

তাঁর অভিমত, “মানুষ হিসেবে নারীর সমান সম্মান, অধিকার এবং তাঁর স্বাধীন সত্তার ব্যাপারে বাংলাদেশিদের সামগ্রিক সচেতনতার যে ঘাটতি রয়েছে, এই রায় তা কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে।”

“দুই আঙুলের মাধ্যমে ধর্ষণ পরীক্ষার পদ্ধতি ভিকটিমকে আবার ধর্ষণ করার শামিল,” বলেও উল্লেখ করেন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের এই নির্বাহী পরিচালক।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষসহ দুই চিকিৎসক ২০১৩ সালে দুই আঙুলের মাধ্যমে ধর্ষণ পরীক্ষার পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।

সেখানে ওই পরীক্ষাকে সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) ও সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার পরিপন্থী দাবি করা হয়। এই আবেদনের পক্ষে ব্লাস্ট’র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শারমিন ছাড়াও লড়েছেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন।

রায়ে মোট আটটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে বেনারকে জানান অ্যাডভোকেট শারমিন।

“বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য বিধি অনুযায়ী গত বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সরকার যে ‘হেলথ প্রটোকল’ করেছে, সেই বিধি মেনে রেপ ভিকটিমদের পরীক্ষা ও ভার্জিনিটি টেস্ট করতে বলেছে আদালত,” বলেন তিনি।

শারমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, “প্রটোকলটি দেশের সব নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং হাসপাতালে পাঠিয়ে তা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।”

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, “ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুদের পরীক্ষা করার সময় একজন গাইনোকলজিস্ট, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, নারী পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনে ভিকটিমের একজন নিকট আত্মীয়কে সেখানে রাখতে হবে।”

শারমিন বলেন, “পরীক্ষার প্রতিবেদনে অনেক সময় লেখা থাকে ধর্ষিতা ‘যৌনকর্মে অভ্যস্ত’। কিন্তু আদালত বলেছে বিশেষজ্ঞ অভিমতের কোথাও এই কথাটি আর বলা যাবে না।”

“রায় অনুযায়ী কোনো পক্ষের আইনজীবী ভিকটিমকে মর্যাদাহানিকর প্রশ্ন করতে পারবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিষয়টি নিশ্চিত করবেন,” যোগ করেন এই আইনজীবী।

এর আগে আবেদনটি নিয়ে শুনানি করে ‘টু ফিংগার টেস্ট’ কেন বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল দেয় হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ।

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও ফরেনসিক বিভাগের প্রধানকে ডেকে এ বিষয়ে তাঁদের ব্যাখ্যা শোনে আদালত।

পাশাপাশি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের ডাক্তারি পরীক্ষার বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ‘টু ফিংগার টেস্ট’ ও ‘বায়ো ম্যানুয়াল টেস্ট’ নিষিদ্ধ করে এই রায় দিল হাই কোর্ট।

“বায়ো ম্যানুয়াল টেস্টের কারণে মেয়েদের বিভিন্ন গায়নোকলজিক্যাল সমস্যা হয়’ বলেও রায়ে উল্লেখ রয়েছে,” জানান শারমিন।

নেতিবাচকতা থেকে মুক্তি নেই

রোকেয়া কবির বেনারকে বলেন, “এই রায়ের ফলে ভিকটিম মামলা তদন্ত ও বিচারকালে হয়রানি থেকে রেহাই পাবে। তবে ধর্ষণের শিকারেরা যে শারীরিক ও মানসিক আঘাত পায় এবং তাদের ব্যাপারে সমাজের যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, তা থেকে কিন্তু তারা মুক্তি পাবে না।”

“তবে একবার ধর্ষিত হওয়ার পর বিচার চাইতে গিয়ে তাদের বারবার যে মানহানিকর ও হয়রানিমূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এত দিন, তা আর হবে না,” যোগ করেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধা।

মামলার পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত ১৮ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে জানান, দেশে গত চার বছরে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আইন মন্ত্রী আনিসুল হক জানান, দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

রোকেয়া কবির বলেন, “নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রেও নারীরা নানাভাবে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।”

“তবে সোশ্যাল ট্যাবু ভেঙে ধর্ষিতারা এখন মিডিয়ার সামনে মুখ খুলছে। এটা ভালো দিক। মিডিয়ার আন্তরিকতায় ধর্ষণের খবরের প্রচার বেড়েছে,” বলেন তৃণমূল নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখা এই নারী।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।