লুই কানের নকশা ঢাকায় আসার পর জিয়ার কবর সরানো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.12.05
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়াউর রহমানের মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ নেতা–কর্মীরা। নভেম্বর ০৭, ২০১৬।
স্টার মেইল

লুই ইসাডোর কানের তৈরি করা জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশা বাংলাদেশে এসে পৌঁছার পর প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওই নকশা আনার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এর লক্ষ্য জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে দেওয়া।

বিএনপির নেতারা বলছেন, কবর সরিয়ে দেওয়া হলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। অন্যদিকে সরকারি দলের নেতাদের কেউ কিউ কিছুটা বিদ্রুপ করে বলছেন, জিয়াউর রহমানের ওই কবরে তাঁর দেহাবশেষ রাখা হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার ৪০টি বাক্সে মূল নকশার চারটি করে সেট যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা এসে পৌঁছে। এই নকশা আনতে সরকার প্রায় চার লাখ ডলার বরাদ্দ করে, যা তিন কোটি কুড়ি লাখ টাকার কাছাকাছি।

এই নকশা আসার ফলে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজে এক ধাপ অগ্রগতি হলো। আগেই সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, নকশা এনে কবর সরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সরকার।

নকশার সঙ্গে জিয়ার কবর প্রসঙ্গ

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, লুই কানের মূল নকশা আনা বা কবরগুলো সরিয়ে দেওয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে জিয়াউর রহমানের কবর সরানো। জাতীয় সংসদ এলাকা থেকে জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর কথা বলে সরকার ‘দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে’ বলে গত রোববার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাই​লে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বেনারকে বলেন, লুই কানের নকশায় ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি হয়েছে সংসদ এলাকায়, সেখানে একটি কবরস্থান, একটি সম্মেলনকেন্দ্রসহ আরও বেশ কিছু স্থাপনা দৃশ্যমান।

তিনি আরও বলেন, এসব স্থাপনার কারণে সংসদ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ কেউ করেনি। তাই প্রয়াত একজন রাষ্ট্রপতির মাজার সরাতে এতোসব তুলকালাম কাণ্ড করা ঠিক হবে না।

অবশ্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন বেনারকে বলেন, “সরকার কারও কবর সরানোর জন্য সংস্কার কাজ করবে না। লুই আই কানের নকশা যেভাবে আছে সে অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য যা করণীয়, সবই করা হবে।”

লুই কানের নকশার কোথাও শেরেবাংলা নগরে কবরস্থানের জন্য জায়গা নির্ধারিত ছিল না—এ কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “আমি মনে করি, সংসদ এলাকা থেকে কবর ছাড়াও নকশাবহির্ভূত সব স্থাপনা সরানো উচিত।”

রাজনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, সংসদ ভবনের সীমানায় জিয়াউর রহমানের দেহাবশেষ আনা হয়েছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ও উদ্দেশ্যে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যার পর প্রথমে দাফন করা হয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। পরে সেখান থেকে তাঁর দেহাবশেষ তুলে এনে ২ জুন চন্দ্রিমা উদ্যানে সমাহিত করা হয়।

২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবরকে কেন্দ্র করে পাঁচ বিঘা জমিতে সমাধি কমপ্লেক্স গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়।

সংসদ এলাকায় নকশাবহির্ভূত যত স্থাপনা

স্থপতি লুই কানের নকশায় শেরেবাংলা নগর এলাকায় কবরস্থানের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি, এই যুক্তিতে জিয়াউর রহমানসহ সেখানকার আরও সাতটি কবর সরানোর পক্ষে মত দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আটজন নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে পাঁচ বিঘা জমিতে ‘জাতীয় কবরস্থান’ নাম দিয়ে সাতজনকে সমাহিত করা হয়। এঁরা হলেন; সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান, সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দীন খান।

এই আটটি কবর ছাড়া শেরেবাংলা নগরে আছে লুই কানের নকশাবহির্ভূত আরও সাতটি স্থাপনা। বিএনপি সরকার সেখানকার ১০ একর জমিতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করে, যা পরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নামে নামকরণ করা হয়। এখন সরকার আবার সেখানে সচিবালয় স্থানান্তর করতে চাইলেও লুই কানের মূল নকশা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যেভাবে নকশা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত আসে

সংসদ সচিবালয়ের গণপূর্ত বিভাগ ২০১৩ সালে নকশা বহির্ভূতভাবে সংসদ ভবনের উত্তর ফটক বন্ধ করে সেখানে সংসদ টেলিভিশনের জন্য স্টুডিও নির্মাণের কাজ শুরু করে। এ নিয়ে ওই বছরের ২৩ জুন সংবাদপত্রে প্রতিবেদন ছাপা হলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর হস্তক্ষেপে স্টুডিও নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ডিসেম্বর সংসদ কমিশনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ ভবনের মূল নকশা সংগ্রহের নির্দেশ দেন। এরপর সংসদ সচিবালয় থেকে লুই কানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, তাঁর তৈরি যাবতীয় নকশা পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত আছে।

সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে। নির্মাণ শেষ হয় ১৯৮৪ সালের জুন মাসে। ভবনটি নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় হয় ১২৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

লুই কান যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। কাজের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার ঢাকা আসেন। ১৯৭৪ সালে ১৭ মার্চ ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক হয়ে ফিলাডেলফিয়াতে যাওয়ার পথে পেন নামের একটি স্টেশনে তিনি মারা যান।

স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বেনারকে বলেন, নকশা যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেবেন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে। এরপর গণপূর্ত অধিদপ্তর সংসদ ভবন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারের কাজ শুরু করবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।