পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে চীনা কোম্পানির ত্রুটি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-09-25
Share
পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে  চীনা কোম্পানির ত্রুটি 1000 পদ্মাসেতুর দৃশ্য। আগস্ট ১৭, ২০২০।
ছবি: বেনার নিউজ

পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের নকশায় ‘মারাত্নক’ ত্রুটি চিহ্নিত করেছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ।

আর এই ভুলের জন্য চীনা ঠিকাদার চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন (সিআরইসি) কে দায়ী করেছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম।

১৬ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের পরিচালককে (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত না মেনে পদ্মা সেতু সংযোগ সড়কের কিছু অংশ কেটে পাইল ও পাইলক্যাপ নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে ওই অংশটিতে যানবাহনের নিরাপদ চলাচল ‘মারাত্নকভাবে’ ব্যহত হবে।

এ ছাড়াও, রেল সংযোগের জন্য পিয়ারগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, সংযোগ সড়কের নীচের স্তর থেকে যানবাহন মূল সেতুর দোতলায় উঠতে গেলে সম্মুখ অংশ আটকে যেতে পারে। বেনারনিউজের কাছে ওই চিঠির একটি কপি রয়েছে।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন ডিজাইন ত্রুটির কথা স্বীকার বলেছেন, সেটি সংশোধনযোগ্য।

কী বলা হয়েছে চিঠিতে?

১৬ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পরিচালকের  অফিস থেকে লেখা একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দ্বিতল বিশিষ্ট সেতুর প্রথম তলা রেল চলাচল এবং দ্বিতীয় তলা সাধারণ যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পে মূল সেতুর উভয়প্রান্তে ৩৮ মিটার দূরত্বে সাতটি করে পিয়ারের ওপর এলিভেটেড রেলওয়ে ভায়াডাক্ট মাওয়া প্রান্তে স্লোপে নির্মাণ করা হয়েছে।

জাজিরা প্রান্তে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প কর্তৃক নির্মাণাধীন এলিভেটেড রেলওয়ে ভায়াডাক্ট-৩ পিয়ার নম্বর ২৫-১ ও ২৫-২ এর মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে দক্ষিণমুখী অ্যাপ্রোচ সড়ক আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করেছে যা পদ্মাসেতু প্রকল্প কর্তৃক দুই বছর পূর্বে নির্মিত হয়েছে।

পিয়ার দুটির মাঝখানে ক্রাশ বেরিয়ার স্থাপন করে আনুভূমিক ক্লিয়ারেন্স নয় দশমিক ৬৫১ মিটার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে যা যানবাহনের নিরাপদ চলাচলের জন্য যথেষ্ট নয়। চিঠিতে বলা হয়, ওই দুটি পিয়ার অ্যাপ্রোচ সড়কের সফট শোল্ডার এর বাইরে নির্মাণ করা প্রয়োজন যাতে যেন ক্রেস্ট-টু-ক্রেস্ট প্রশস্থ ও সর্বনিম্ন আনুভূমিক ক্লিয়ারেন্স অন্তত ১৫ দশমিক পাঁচ মিটার হয়।

ওই দুটি পিয়ারে খাড়া ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে পাঁচ দশমিক ৫১৭ মিটার যা কমপক্ষে ছয় মিটার হওয়া অত্যাবশ্যক।

চিঠিতে বলা হয়, ৬ জুলাই সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন ও বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজনীয় ডিজাইন ও আনুষঙ্গিক কাজ সম্পাদনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত ছাড়াই এবং জাজিরা প্রান্তে পিয়ার নম্বর ২৫-১, ২৫-২ এর প্রয়োজনীয় ডিজাইন চূড়ান্ত না করেই পদ্মাসেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঠিকাদার সিআরইসি (চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন) কর্তৃক জাজিরা সংযোগ সড়কের ১০০ মিটার অংশ কেটে পাইল ও পাইল ক্যাপ নির্মাণ করেছে, যা অত্যন্ত বিস্ময়ের।”

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক চিঠিতে বলেন, “ভবিষ্যতে উক্ত স্থানটি নিরাপদ যানবাহন চলাচলের প্রশ্নে মারাত্নক হুমকির সম্মুখীন হয়ে থাকবে।”

চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের বক্তব্য জানতে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে ই-মেইল পাঠানো হলেও কোন জবাব পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রী বলছেন সংশোধনযোগ্য

পদ্মা ব্রিজ রেল সংযোগ প্রকল্পের ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন ও পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান প্রকল্প স্থান দেখতে যান।

রেল সংযোগ প্রকল্পের ত্রুটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে রেলমন্ত্রী সুজন বেনারকে বলেন, “হ্যাঁ, পদ্মা ব্রিজ রেল সেতু সংযোগ প্রকল্পের ডিজাইনে কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। তবে সেটি সংশোধনযোগ্য।”

তিনি বলেন, “রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ পুরোদমে চলছে। আশা করা যায় সময়মতো প্রকল্পটি শেষ হবে।”

কেন পদ্মা সেতু?

নদীমাতৃক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আলাদা করে রেখেছে পদ্মা নদী। ঢাকা থেকে চলাচল করতে নির্ভর করতে হয় ফেরির ওপর। নাব্যতা না থাকায় প্রায় নদীর দুপাশে আটকা পড়ে হাজার হাজার যানবাহন।

স্বাধীনতার পর থেকে সকল সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা বললেও ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে কাজটি করার প্রকৃত উদ্যোগ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার।

দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করলে নিজস্ব অর্থায়নে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতু নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেন শেখ হাসিনা সরকার।

নদী শাসনের কাজ দেয়া হয় সিনোহাইড্রো এবং মূল সেতু নির্মাণের ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে। মূল সেতু নির্মাণের খরচ ধরা হয়েছে তিন দশমিক ৮৬৮ বিলিয়ন ডলার।

এই সেতুতে রেল সংযোগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চীনা সরকারের সাথে ‍চুক্তি স্বাক্ষর করে। চার দশমিক ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচের শতকরা ৮৫ ভাগ আসবে চীনা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মাধ্যমে।

মূল পদ্মা সেতুর শতকরা ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ২০২২ সালের জুন মাসে এই সেতু যানবাহনের জন্য খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একইদিন সেতু দিয়ে ট্রেন চালাতে চায় সরকার।

১৩ বছর সময় লাগবে?

তবে ৯ সেপ্টেম্বর রেল সচিবের সভাপতিত্বে এক সভায় জানান হয়, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২৫ ভাগ। বেনারনিউজের কাছে ওই সভার কার্যবিবরণী রয়েছে।

বলা হয়, প্রথমে ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ করার কথা থাকলেও পরে আরও দুবছর বৃদ্ধি করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। দুদফায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির পর বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে চার দশমিক ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সভায় জানানো হয়, কাজের গতি বাড়ানো না হলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প শেষ হতে এখন থেকে আরও আট বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ প্রকল্পটি শেষ হতে ২০১৬ সাল থেকে প্রায় ১৩ বছর লেগে যাবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান বেনারকে বলেন, “আমি ও রেলমন্ত্রী বৃহস্পতিবার পদ্মাসেতু প্রকল্প দেখতে গিয়েছিলাম। ভালোভাবে কাজ চলছে।”

তিনি বলেন, “সরকার চায় ২০২২ সালের জুন মাসে যখন পদ্মা সেতু যানবাহনের জন্য খুলে দেয়া হবে তখনই পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলবে। কিন্তু সত্য কথা বলতে কী আমার মনে হয় না সেতু উদ্বোধনের সাথে সাথে ট্রেন পরিচালনা করা যাবে।”

মন্ত্রী বলেন, “এর অন্যতম কারণ হলো, কাজ শুরু হতে দেরি হয়েছে। রেল সংযোগ প্রকল্পটি চীনা অর্থায়নে হচ্ছে। চীনা অর্থ পেতে দেরি হয়। তাদের অনেক আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সেজন্য অনেক সময় পার হয়ে যায়।”

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।